― Advertisement ―

spot_img

১৮৯২ সালে কাউন্সিল আইনের ধারাসমূহ উল্লেখ কর।

ভূমিকা : ১৮৯২ সালের ভারতীয় কাউন্সিল আইনের দ্বারা জাতীয়দের দাবিদাওয়ার একটা বিশেষ দিক বাস্তবায়নের অগ্রগতি সাধন হয়। ভারতীয় উপমহাদেশের শাসনতান্ত্রিক ক্রমবিকাশের ধারায় ১৮৯২ সালের...
Homeঔপনিবেশিক শাসক১৮৫৮ সালের ভারত শাসন আইনের পটভূমি সংক্ষেপে লেখ।

১৮৫৮ সালের ভারত শাসন আইনের পটভূমি সংক্ষেপে লেখ।

ভূমিকা : ইতিহাস পরিবর্তনশীল। আর ইতিহাসের পরিবর্তনের ধারায় ১৭৬৫-১৮৫৭ সাল পর্যন্ত ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজদণ্ড প্রয়োগের ক্ষেত্রে বিরাট পরিবর্তন নিয়ে আসে ১৮৫৮ সালে ভারত শাসন আইন। ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহই ১৮৫৮ সালে ভারত শাসন আইনের প্রত্যক্ষ | তবে ইতিহাসে কোনো কিছুই একদিনেই সংঘটিত হয় | দিক না, তেমনি ১৮৫৮ সালে ভারত শাসন আইনের পেছনে সক্রিয় | ঐক্য ছিল ইংরেজ শাসনের সুদীর্ঘ সময়কালের শোষণ-নির্যাতন।

১৮৫৮ সালে ভারত শাসন আইনের পটভূমি : ১৮৫৮ | মূর্তিগ সালে ভারত শাসন আইন প্রণয়নের মাধ্যমে ভারতে কোম্পানি । শাসনের অবসানে ঘটে এবং ব্রিটিশরাজ ভারতের শাসনভার সরাসরি নিজ হাতে গ্রহণ করেন। ভারত শাসনের ব্যাপারে মহারানিকে সাহায্য করার জন্য ব্রিটিশ মন্ত্রিসভার একজন ভার সদস্যকে ভারত সচিব নিযুক্ত করা হয়। স্যার চার্লস উড প্রথম ধর্মা ভারত সচিবের পদ অলংকৃত করেন। তাকে সাহায্য করার জন্য ১৫ সদস্য বিশিষ্ট একটি কাউন্সিল গঠন করা হয়। ভারতের বড়লাট ভাইসরয় বলে অভিহিত হয়। নিম্নে এই আইন প্রণয়নের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করা হলো :

১. ব্রিটিশ শাসনের প্রতি ভারতীয়দের অনীহা : ১৭৫৭ সালের পর থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একের পর এক ভারতীয় ভূখণ্ড দখল করে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে থাকেন। এর ফলে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে তীব্র ব্রিটিশ বিরোধী মনোভাব দেখা দেয়। এছাড়া কোম্পানি শাসনের মোড়ল হিসেবে ভারতবর্ষে এমন অনেকের আবির্ভাব হয়েছিল যাদের কেউ ছিলেন নি ভারতবাসীর প্রতি নামমাত্র উদার, কেউ কঠোর, কেউ নি সাম্রাজ্যবাদী প্রভৃতি প্রকৃতির। সাম্রাজ্যবাদী লর্ড ডালহৌসির | স্বত্ববিলোপ নীতির মাধ্যমে সাতারা, ঝাঁসি, নাগপুর, সম্বলপুর ি প্রভৃতি রাজ্য ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত হয়। কর্ণাটক, অযোগ্যা, মারাঠা। শাসকবর্গ ও ক্ষমতাচ্যুত হন। এভাবে ক্রমে ব্রিটিশ শাসনের প্রতি ভারতীয়দের তীব্র অনীহা দেখা দেয়।

২. ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অর্থনৈতিক শোষণ : ব্রিটিশ | শাসনের পূর্বে এদেশ ছিল কৃষি ও শিল্পে সমৃদ্ধ। কিন্তু কোম্পানির শাসনে এদেশে শুরু হয় লাগামহীন শোষণের পালা। চিরস্থায়ী | বন্দোবস্তের মাধ্যমে কৃষকরা জমিহারা হয়। তদুপরি অতিরিক্ত করভার তাদেরকে নিঃস্ব করে দেয়। স্থানীয় শিল্পের ধ্বংসের পাশাপাশি নীলচাষের মাধ্যমে দেশীয় জমি হয়ে উঠে অনুর্বর। এছাড়াও কোম্পানির অন্যায়মূলক রাজস্বনীতির ফলে এদেশের সমৃদ্ধ কৃষককুল সহায়সম্বল হারিয়ে পথে বসেন। ফলে শাসক শাসিতের ব্যবধান বেড়ে যায় বহুগুণ।

৩. সামাজিক বৈষম্য : ১৮৫৮ সালের ভারত শাসন আইনের মূলে ছিল ব্রিটিশ ভারতীয়দের মধ্যকার সামাজিক বৈষম্য কমিয়ে আনা। বিজিত ভারতবাসীর প্রতি বিজেতা ব্রিটিশদের ঘৃণার মনোভাব ভারতীয়দের মনে বেদনার সৃষ্টি করেছিল। সামাজিক দিক থেকে কখনও ভারতীয়দের সাথে কোম্পানির কোনো ঐক্যভাব গড়ে উঠেনি। ইংরেজরা ভারতবাসীকে বর্বর বলে অভিহিত করতো এবং খ্রিস্টান ধর্মযাজকগণ প্রকাশ্যে হিন্দুদের মূর্তিপূজা ও সামাজিক সংস্কারবাদির নিন্দা করতো ।

৪. ধর্মীয় অপব্যাখ্যা : ভারত শাসন আইনের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল ভারতীয়দের ধর্মরক্ষার ব্যাপারে ইংরেজদের প্রতিশ্রুতিদান ভারতে খ্রিস্টান মিশনারীদের তৎপরতায় ভারতীয়দের মনে এ আশঙ্কা জন্মায় যে, ইংরেজ শাসনে তারা ধর্মান্তরিত হতে বাধ্য। এছাড়া মন্দির বা মসজিদ পরিচালনার জন্য নির্দিষ্ট ভূমি এবং দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর করারোপের সরকারি নীতি ভারতীয় জনগণের ধর্মীয় চেতনায় চরম আঘাত হানে। তদুপরি ১৮৫০ সালে সরকার এমন একটি আইন করে যে, খ্রিস্টধর্ম অবলম্বনকারীকে তার পৈত্রিক সম্পত্তির উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। এর ফলে হিন্দু-মুসলমান উভয়েই নিজ নিজ ধর্মের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে প্রমাদ গুণে |

৫. ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ : ভারত শাসন আইনের পটভূমিতে রয়েছে ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ । প্রত্যক্ষ পটভূমিতে ভারতীয়দের যদিও পূর্বে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে নিয়োগ করা হতো তাদের প্রতি প্রদর্শিত হতো চরম বৈষম্য। ভারতীয়দেরকে নিগার, শুয়োর ইত্যাদি বলে গালিগালাজ করা হতো। তদুপরি সিপাহিদের কপালে তিলককাটা নিষিদ্ধকরণ, দাঁড়ি কামানো, পুরানো পাগড়ির ব্যবহারের জন্য চাপ প্রয়োগ ইত্যাদি ভারতীয় সিপাহিদের মনে অসন্তোষের সৃষ্টি করেছিল। এভাবে সিপাহিদের মনে যখন রাজনৈতিক অসন্তোষ বিরাজমান তখন ব্রিটিশ সরকার এনফিল্ড নামক এক প্রকার রাইফেলের ব্যবহার শুরু করে। এতে এক প্রকার গুজব উঠল যে, এনফিল্ড রাইফেলের কার্তুজে গরু ও শূকরের চর্বি মাখানো আছে এ চর্বি দাঁত দিয়ে কেটে বন্দুকে পুরতে হতো। এতে সিপাহিরা বিদ্রোহ শুরু করলেন। ক্রমে এ বিদ্রোহ সারা ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়ে। এই ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহে ব্রিটিশ কোম্পানির শাসনের টনক নড়ে ওঠে।

৬. ব্রিটিশ পার্লামেন্টের বিল প্রণয়ন : পরিবর্তনের হাওয়া পূর্ব থেকে শুরু হলেও ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ ব্রিটিশ সরকারকে কোম্পানির স্থলে নিজ হাতে শাসন নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করায়। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী লর্ড পামারস্টোন এ সম্পর্কিত একটি বিল পার্লামেন্টে উপস্থাপন করেন। পামারস্টোন বোর্ড অব কন্ট্রোল এবং কোর্ট অব ডাইরেক্টরসের পরিবর্তে লন্ডনে একজন প্রেসিডেন্ট এবং তাকে সাহায্য করার জন্য আট সদস্যবিশিষ্ট একটি কাউন্সিলের প্রস্তাব করেন। ভারতে বেসামরিক সামরিক ও রাজস্ব সংক্রান্ত সমস্ত কার্যক্রম এই কাউন্সিলের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। যেসব ব্যক্তি কোম্পানির ডাইরেক্টর ছিলেন অথবা ভারতে যারা কোম্পানির রাজকর্মচারী ছিলেন তাদেরকে এই কাউন্সিলের সদস্য বলে অভিহিত করেন। কিন্তু বিলপাসের আগেই পামারস্টোনের স্থলাভিষিক্ত হন লর্ড ডারবি। তিনি ডিজরেইলীকে নিযুক্ত করেন এই বিষয়ে। হাউস অব কমন্সে তীব্রভাবে সমালোচিত হওয়ায় ডিইরেইনী প্রত্যাহত হন। পরবর্তীতে বোর্ড অব কন্ট্রোলের প্রেসিডেন্ট লর্ড স্টনেলি একটি নতুন বিল পাস করেন যেখানে পামারস্টোনের সকল প্রস্তাবই অন্তর্ভুক্ত ছিল । জন স্টুয়ার্ট মিল কোম্পানির পক্ষ হয়ে এই সময় পার্লামেন্টের উভয় হাউজে প্রস্তাব পেশ করেন। যাতে তিনি কোম্পানির পক্ষে যুক্তি দেখান। কিন্তু তা ধোপে টিকেনি। ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহে কোম্পানির ভাগ্য নির্দিষ্ট হয়ে গিয়েছিল। ১৮৫৮ সালের ২ আগস্ট লর্ড স্টানলির এই বিল পার্লামেন্টে রাজকীয় অনুমোদন লাভ করে। ১৮৫৮ সালের ১ নভেম্বর ইংল্যান্ডের মহারানির স্বপক্ষে এক ঘোষণাপত্র জারি করেন। ১৮৫৮ সালের এই “ভারত শাসন আইন” ভারতকে একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ব্রিটিশ রাজ্যের শাসনাধীন নিয়ে আসে ।

— ১৮৫৮ সালে ভারত শাসন আইনের শর্তাবলি : ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের ফলে ভারতের কেবলমাত্র কোম্পানির অবসান হয়নি ভারতের শাসন ব্যবস্থায় বেশ কিছু মৌলিক পরিবর্তন ঘটে। ১৮৫৮ সালে যে আইন দ্বারা ভারতের ব্রিটিশ পার্লামেন্টের কর্তৃত্ব স্থাপিত হয় তা ছিল ভারতের উন্নত ধরনের শাসন প্রবর্তনের আইন। এ আইনের দ্বারা ভারতের শাসনের ব্যাপারে ভাতের সচিব সর্বেসর্বা হয়ে উঠেন। আইনগত তিনি পার্লামেন্টের কাছে দায়ী থাকলেও ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ভারত সম্পর্কে উদাসীন ছিল। কিন্তু এই আইনের দ্বারা বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটে। সেগুলো হলো-

১. আইন পরিষদে ভারতীয়দের গ্রহণ;
২. রাজস্ব বিভাজন;
৩. স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন প্রবর্তন;
৪. ভারতে ব্রিটিশ পুঁজির অনুপ্রবেশের ব্যাপকতা;
৫. সামরিক বিভাগের পরিবর্তন;
৬. মহাবিদ্রোহের পরবর্তীকালে সরকারি নীতি অবলম্বন এবং
৭. সরকারি ও সমাজ সংস্কার নীতির ক্ষেত্রে উদাসীনতা প্রভৃতি ।
→ মহারানি ভিক্টোরিয়ার ঘোষণাপত্র : ১৮৫৮ সালের ১ নভেম্বর = মহারানি ভিক্টোরিয়ার ঘোষণাপত্র মারফত ভারতের শাসনভার গ্রহণ করে এই ঘোষণাপত্র জারি করেন । এই ঘোষণাপত্রে বলা হয় যে-
১. ভারতবাসীর ধর্মীয় ও সামাজিক কোনো ব্যাপার কোম্পানি আর
হস্তক্ষেপ করবে না;
২. প্রত্যেক ভারতবাসী ধর্মীয় স্বাধীনতা গ্রহণ করবে; ৩. জাতি, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে যোগ্যতাসম্পন্ন সকল ভারতবাসী সরকারি চাকরিতে নিযুক্ত হতে পারবে।
এছাড়া ও এই ঘোষণাপত্রে বলা হয় যে,
১. স্বত্ববিলোপনীতি পরিত্যাগ করতে হবে;
২. দেশীয় রাজাদের দত্তক গ্রহণের অধিকার দিতে হবে এবং বলা হয় যে, সরকার ভারতে আর সাম্রাজ্য বিস্তারে আগ্রহী নয় এবং
৩. দেশীয় রাজাদের বলা হয় যে, কোম্পানির সঙ্গে স্বাক্ষরিত তাদের সমস্ত চুক্তি ও সন্ধিগুলোকে মেনে চলতে হবে ।
— ১৮৫৮ সালের ভারত শাসন আইনের ত্রুটিসমূহ : ১৮৫৮ সালের ভারত শাসন আইন ও মহারানির ঘোষণাপত্র কেবল কাগজে কলমে সীমাবদ্ধ ছিল। মহারানির ঘোষণাপত্রে ভারতীয় ও ইউরোপীয়দের সমান আচরণ ও অধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়। কিন্তু এই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। যেমন-
১. জাতি, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে চাকরি ক্ষেত্রে বড় বড় কথা বলা হলেও উচ্চ পদগুলোতে ভারতবাসীদের সেভাবে সুযোগ দেওয়া হয়নি ।
২. ভারতবাসী যেন সরকারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে না পারে সেজন্য ব্রিটিশ সরকার মহাবিদ্রোহের পরবর্তীকালে বিভেদ নীতি অবলম্বন করেন।
৩. বিভিন্ন ধর্ম সম্প্রদায়ের জাতি গোষ্ঠী ও বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষকে পরস্পরের বিরুদ্ধে বিদ্বেষভাবাপন্ন করে তোলা হয় ।
৪. শিক্ষিত ভারতীয়দের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ কোনো সম্পর্ক স্থাপন না করে ব্রিটিশ সরকার ভারতীয় রাজা-মহারাজা, জমিদার, ভূস্বামী প্রভৃতিদের সঙ্গে বন্ধুত্ব সম্পর্ক তৈরি করেন।
৫. এছাড়াও পরবর্তীকালে ভারতবাসীর সমাজ ও ধর্মীয় জীবন সম্পর্কে ব্রিটিশদের উদাসীনতা দেখা দেয়। তবে এই উদাসীনতা তারা সর্বদাই বজায় রাখতে পারনি।
১৮৫৮ সালের আইন বা মহারানির ঘোষণাপত্রে উল্লেখিত প্রতিশ্রুতিগুলো মুহূর্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। শাসক সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে হতাশা ও ঘৃণার সঞ্চার হয় এবং ভারতীয়দের মনে জাতীয়তাবাদী চেতনা সঞ্চারিত করেছিল ।

উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, ১৮৫৮ সালের আইনের মাধ্যমে ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটায় এবং এর বদলে সরাসরি ব্রিটিশ সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি ছিল ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিপ্লবের প্রত্যক্ষ ফল । যদি ও বিপ্লব ব্যর্থ হয়, তথাপি এটি ভারতের ঔপনিবেশিক প্রশাসনে অতি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনয়নে সমর্থ হয় ।