― Advertisement ―

spot_img

১৮৯২ সালে কাউন্সিল আইনের ধারাসমূহ উল্লেখ কর।

ভূমিকা : ১৮৯২ সালের ভারতীয় কাউন্সিল আইনের দ্বারা জাতীয়দের দাবিদাওয়ার একটা বিশেষ দিক বাস্তবায়নের অগ্রগতি সাধন হয়। ভারতীয় উপমহাদেশের শাসনতান্ত্রিক ক্রমবিকাশের ধারায় ১৮৯২ সালের...
Homeঔপনিবেশিক শাসক১৯৪২ সালের ক্রিপস মিশন' সম্পর্কে আলোচনা কর।

১৯৪২ সালের ক্রিপস মিশন’ সম্পর্কে আলোচনা কর।

অথবা, ক্রিপস মিশন পরিকল্পনা সম্পর্কে যা জান লিখ।

ভূমিকা : পলাশী যুদ্ধে পরাজয়ের মাধ্যমে বাংলার ক্ষমতা ব্রিটিশ সরকারের হাতে চলে যায়। কোম্পানি ও ব্রিটিশ সরকারের শাসনামলে ভারতবর্ষে বিভিন্ন দাবিতে অনেক সময় রাজপথ সরব হয় । ১৯৪২ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ইংল্যান্ড যুদ্ধ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। অন্যদিকে ভারতবর্ষে মুসলিম লীগের স্বতন্ত্র আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার দাবি এবং কংগ্রেসের স্বাধীন- সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি ভারতবর্ষে একটি সমস্যা সৃষ্টি করে। এ সমস্যার মুখে ব্রিটিশ সরকার সমাধানের লক্ষ্যে ১৯৪২ সালের ২৩ মার্চ ব্রিটেনের অর্থমন্ত্রী স্যার স্ট্যাফোর্ড ক্রিপসকে ভারতের সমস্যা সম্পর্কে আলোচনার জন্য প্রেরণ করেন। স্ট্যাফোর্ড ক্রিপস সুনির্দিষ্ট কয়েকটি প্রস্তাব ঘোষণা করেন, যা তার নামানুসারে ক্রিপস মিশন নামে পরিচিত ।

→ ক্রিপস প্রস্তাবের পটভূমি : ব্রিটিশ ভারত শাসন যুগে পুরো সময়টাই কোনো কোনো সমস্যায় ব্রিটিশ এবং ভারতীয়দের মধ্যে সংঘটিত হয়েছিল। ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের মাধ্যমে ভারতবাসীকে যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় তা কার্যকরী না হওয়ায় ভারতের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলের মধ্যে অসন্তোষ দেখা যায়। আর এর পরবর্তীতে আর এক সমস্যা শুরু হয়। মুসলমানদের পক্ষ থেকে মুসলিম লীগ পৃথক এক আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার দৃঢ় সংকল্প এবং কংগ্রেস ভারতকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি আদায়ের লক্ষ্যে তারা আন্দোলন শুরু হয়। কংগ্রেসের মন্ত্রিসভাগুলোর কার্যকলাপের ফলে হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক সম্পর্ক বিনষ্ট হয়। মুসলিম লীগ এবং কংগ্রেসের বিরোধিতা দিনে দিনে আরো ব্যাপক আকার ধারণ করে। বিশেষ করে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এই সমস্যার সমাধান অতি জরুরি হয়ে পড়ে। এদিকে প্রাদেশিক কংগ্রেস মন্ত্রিসভাগুলো ১৯৩৯ সালের ১৫ নভেম্বরের মধ্যে ব্রিটিশ যুদ্ধ নীতির প্রতিবাদে পদত্যাগ করে। মুসলিম লীগও এই পদত্যাগে আনন্দ প্রকাশ করে। ‘নাজাত দিবস’ উদযাপনের ডাক দেয়। এদিকে এই দাঙ্গার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৪০ সালে রামগড় অধিবেশনে পূর্ণ স্বাধীনতার কংগ্রেসের লক্ষ্য হিসেবে ঘোষণা দেয়। এছাড়া মুসলিম লীগ ১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাব ঘোষণা করে। ফলে সমগ্র ভারতবর্ষে এক নৈরাজ্যকর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। এই সমস্যা ব্রিটিশ সরকারকে উদ্বিগ্ন করে তোলে। এ অবস্থায় আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট ভারতীয় সমস্যা সমাধানের জন্য মার্শাল চীয়াং কাইশেরকে চাপ দেন। কারণ আমেরিকার ভয় ছিল দ্বিতীয় = মহাযুদ্ধে ভারতের ব্রিটিশ সরকারের প্রতি মনোভাবের পরিবর্তন না হলে ভারত এশিয়াবাসী হিসেবে জাপানকে সমর্থন করতে পারে। জাপান ১৯৪১ সালের ৭ ডিসেম্বর পাল হাৎপার আগমন করেন এবং জাপান সৈন্যগণ অতিদ্রুত দূরপ্রাচ্য দখল করে বলা হয় ে ভারতের পূর্ব প্রান্তে উপস্থিত হলে ব্রিটিশ সরকার এ যুদ্ধে হবে। প্রাে ভারতীয় জনগণের কাছ থেকে সাহায্য সহযোগিতা প্রত্যাশা একটি নিব করে। ভারতীয় এই সমস্যা মার্কিন সিনেটেও আলোচিত হয়। নির্বাচকম এক পর্যায়ে রুজভেল্ট তার বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ক দূত বলা হয়, হ্যরিমানকে এক পর্যায় ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিলকে ভারতীয় || জনসংখ্যা সমস্যা সমাধানের জন্য আলোচনার কথা বলেন। এই সময় চার্চিল ও মারিমানের মধ্যে এক আলোচনা বৈঠক হয় এবং চার্চিল মিশন প্র ভারতীয় সমস্যাকে সমাধানের অতীত বলে বর্ণনা করেন। দুটো শব্ পরবর্তীতে ৮ই মার্চ রুজভেল্ট পুনরায় চার্চিলের কাছে একবার্তায় বলেন, ভারতীয় সমস্যাকে যুদ্ধজয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ | যদি ন বলে বর্ণনা করেন। অপরদিকে এই সমস্যা সমাধানের জন্য প্রদেশ ব্রিটেনের শ্রমিক দলও চাপ দেন। তাই সবকিছু বিবেচনা করে ইচ্ছাম ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল ১৯৪২ সালের ৮ মার্চ পার্লামেন্টের এক ঘোষণায় ভারতীয় সমস্যা সমাধানের জন্য একটি মিশন গঠনের কথা উল্লেখ করেন। এই ঘোষণা অনুসারে, ১৯৪২ সালের ২৩ চুক্তি মার্চ ব্রিটেনের অর্থমন্ত্রী স্যার স্ট্যাফোর্ড ক্রিপস ভারতীয় নেতাদের সাথে আলোচনার জন্য কয়েকটি প্রস্তাব নিয়ে ভারতে উপস্থিত হন। তিনি কংগ্রেস ও মুসলিম লীগকে বার বার আলোচনায় | ক্রিপা বসার জন্য আহ্বান করেন। কিন্তু তারা আহ্বানে সাড়া না দেওয়ায় ১৯৪২ সালের ৩০ মার্চ স্ট্যাফোর্ড ক্রিপস তার নিজস্ব স্বাধী পরিকল্পনা জনসম্মুখে প্রচার করেন, যা ইতিহাসে ক্রিপস মিশন প্রস্তাব নামে বিখ্যাত ।

→ ক্রিপস প্রস্তাবের শর্তাবলি : ১৯৪২ সালের ৩০ মার্চ চেষ্ট স্ট্যাফোর্ড ক্রিপস এবং প্রকাশিত প্রস্তাবসমূহের শর্তাবলি নিম্নরূপ :

১. যুক্তরাষ্ট্রীয় ইউনিয়ন গঠন : ১৯৪২ সালের ক্রিপস মিশনে পরি বলা হয় যে, ভারতে একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় ইউনিয়ন হবে এবং যে রা ডোমিনিয়ন গঠন করা হবে তা অন্যান্য ডোমিনিয়নের সমকক্ষ হবে।

২. ডোমিনিয়ন প্রতিষ্ঠা : ক্রিপস মিশন প্রস্তাবে বলা হয় যে, ভারতকে পৃথক ডোমিনিয়নের মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করা হবে এবং যে ডোমিনিয়ন গঠন করা হবে তা অন্যান্য ডোমিনিয়নের সমকক্ষ হবে।

৩. ব্রিটিশ রাজা/রানির কর্তৃত্ব বৃদ্ধি : ১৯৪২ সালের ক্রিপস মিশন পরিকল্পনায় বলা হয় যে, গণপরিষদ কর্তৃক নতুন সংবিধান রচনা না হওয়া পর্যন্ত বিশ্বযুদ্ধজনিত কারণে ভারতের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব ভারত সরকারের উপর থাকবে। আর সামরিক, নৈতিক ও বস্তুগত সম্পদকে সংগঠতি করার দায়িত্ব ভারত সরকারের উপর ন্যস্ত থাকবে ।

৪. নতুন সংবিধান প্রণয়ন : ক্রিপস মিশনে বলা হয় যে, ২য় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে ভারতের জনগণের চাহিদা অনুযায়ী একটি নতুন সংবিধান প্রণয়ন করতে হবে। যে সংবিধানে ভারতবাসীর সকল নাগরিকের সুযোগ-সুবিধা লিপিবদ্ধ থাকবে।

৫. গণপরিষদ গঠন : ১৯৪২ সালে ক্রিপস মিশন প্রস্তাবে আরও বলা হয় যে, সংবিধান প্রণয়নের জন্য একটি গণপরিষদ গঠন করা হবে। প্রাদেশিক আইন সভাগুলোর নিম্নকক্ষের সকল সদস্যদের নিয়ে একটি নির্বাচকমণ্ডলী গঠিত হবে। গণপরিষদের সদস্য সংখ্যা উক্ত ।। নির্বাচকমণ্ডলীর সদস্য সংখ্যার এক-দশামাংশ হবে। এখানে আরো বলা হয়, গণপরিষদে ভারতীয় দেশীয় রাজ্যগুলো তাদের মোট জনসংখ্যার অনুপাতে অংশগ্রহণ করতে পারবে।

৬. শর্তসাপেক্ষে শাসনতন্ত্র গ্রহণ : ১৯৪২ সালের ক্রিপস মিশন প্রস্তাবে ব্রিটিশ সরকার গণপরিষদ কর্তৃক প্রণীত শাসনতন্ত্র দুটো শর্তে গ্রহণ করবেন । যথা :

(ক) প্রথম শর্তে বলা হয়, ব্রিটিশ ভারতের কোনো প্রদেশ যদি নতুন সংবিধান গ্রহণ করতে অসম্মতি জানায় তবে সে প্রদেশ ভারতীয় ইউনিয়ন থেকে বের হয়ে গিয়ে নিজেদের ইচ্ছামতো পৃথক শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করতে পারবে ।
(খ) ব্রিটিশ সরকার ও গণপরিষদের মধ্যে বর্ণগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের স্বার্থ ও অধিকারের নিশ্চয়তা বিধানের জন্য একটি চুক্তি সাক্ষরিত হবে ।

→ ক্রিপস মিশনের ব্যর্থতা : নিম্নে ক্রিপস মিশনের ব্যর্থতা সংক্ষেপে আলোচনা করা হলে ব্রিটিশদের ঔদাসিক মনোভাব : ক্রিপস মিশন ব্যর্থতার জন্য ব্রিটিশ, সরকারের ঔদাসিক মনোভাবকে অনেকাংশে দায়ী করা যায়। কারণ ভারতকে পূর্ণ স্বাধীনতা ঘোষণা করতে ব্রিটিশ সরকার কখনো ইচ্ছুক ছিল না। আর ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী চার্চিল ছিল ধূর্তবাজ। তাই তিনি ভারতবাসীকে আশার বাণী শুনিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করার চেষ্টা করেন, ফলে ক্রিপস মিশন ব্যর্থ হয় ।

১. ভারতে অনুপযুক্ত রাজনৈতিক পরিবেশ : ক্রিপস মিশন পরিকল্পনা যখন পাস হয় তখন ভারতে এক অনুপযুক্ত রাজনৈতিক পরিবেশ বিরাজ করছিল। অর্থাৎ কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে দ্বন্দ্ব পরস্পরের মধ্যে সন্দেহ সৃষ্টি করে। ব্রিটেনের চার্চিলের ঘোষণা ও ভারতীয়দের মনে বিরূপ প্রধানমন্ত্রী চার্চিলের ঘোষণা প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল। এরূপ বৈরি পরিবেশে এরকম শাসনতান্ত্রিক পদক্ষেপ ব্যর্থ হওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল।

২. কংগ্রেসের মনোভাব : কংগ্রেসের বিরূপ মনোভাব ও এই মন্ত্রিমিশন পদক্ষেপ ব্যর্থ হওয়ার জন্য দায়ী ছিল। দেশ রক্ষা বিভাগ ভারতীয়দের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়নি।
(ক) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান সংবিধান কার্যকর রাখার প্রস্তাবও কংগ্রেসের মনঃপূত হয়নি।
(খ) অবিলম্বে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা প্রদানের কথা এ প্রস্তাবে উল্লেখ ছিল না ।
(গ) সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারার ভিত্তিতে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা কংগ্রেসের আশানুরূপ হয়নি।

৩. মুসলীম লীগের মনোভাব : বলা চলে মুসলিম লীগের মনোভাবও ক্রিপস মিশন প্রস্তাব ব্যর্থ হওয়ার জন্য দায়ী ছিল ।
(ক) বর্ণ ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের স্বার্থ রক্ষার প্রশ্নে কোনো স্পষ্ট প্রস্তাব ছিল না ।
(খ) এ প্রস্তাবে সুস্পষ্টভাবে পাকিস্তান দাবি মেনে নেওয়া হয়নি । (গ) মুসলমানদের নিয়ে পৃথক গণপরিষদ গঠনের কথাও উক্ত-প্রস্তাবে গৃহীত হয়নি

উপসংহার : উপরোক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, ভারতে মুসলিম লীগ ও কংগ্রেসের মধ্যে বিরাজমান সমস্যা সমাধানের উদ্দেশ্যই ১৯৪২ সালে ব্রিটিশ সরকারের পদক্ষেপ হিসেবে ব্রিটেনের অর্থমন্ত্রী স্যার স্ট্যাফোর্ড ক্রিপস এ প্রস্তাব উত্থাপন করেন। এ প্রস্তাব ভারতবাসীর জন্য একেধারে অমঙ্গলজনক ছিল না। কিন্তু মুসিলিম লীগ ও কংগ্রেসের অসহযোগিতায় এ প্রস্তাব কার্যকর হয়নি এবং শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। তথাপি ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে এ প্রস্তাবের গুরুত্ব কম নয় ।