― Advertisement ―

spot_img

১৯৪৭ সালে ভারত কেন বিভক্ত হয়েছিল? এই বিভক্তি কি অপরিহার্য ছিল?

অথবা, ১৯৪৭ সালের ভারত বিভক্তির প্রেক্ষাপট আলোচনা কর। ভূমিকা : পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো শাসনই চিরস্থায়ী নয়। যার শুরু আছে তার শেষও আছে। তবে কারো কারো...
Homeদক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস১৯৩৫ সালের লাহোর প্রস্তাবের তাৎপর্য ব্যাখ্যা কর।

১৯৩৫ সালের লাহোর প্রস্তাবের তাৎপর্য ব্যাখ্যা কর।

অথবা, ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের গভর্নর জেনারেলের ক্ষমতা ও কার্যাবলি বিশ্লেষণ কর।

ভূমিকা : ভারতের সাংবিধানিক বির্তনের ইতিহাসে ১৩০৫ সালের ভারত শাসন আইন একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। ১৯১৯ সাল থেকে ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১৬ বছর ভারতীয় জনগণের মধ্যে জাতীয়তাবোধের উন্মেষ, রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ এবং ১৯১৯ সালের ভারত শাসন আইনের ব্যর্থতার ফলশ্রুতি হলো ১৯৩৪ সালের ভারত শাসন আইন । এ আইনটি পরবর্তীকালে ভারতের রাজনৈতিক অগ্রগতি এবং ১৯৪৭ সালের ভারতীয় স্বাধীনতা আইনের মূলভিত্তি রচনা করে। এ আইনটিতে গভর্নর জেনারেলকে সর্বাধিক ক্ষমতা দেয়ার মাধ্যমে – তা কার্যকরী করার ব্যবস্থা করা হয়।

→ গভর্নর জেনারেলের পদাধিকার : ১৯৩৫ সালের আইনানুযায়ী গভর্নর জেনারেল ছিলেন এ শাসন কাঠামোর মূল ভিত্তিস্তম্ভ। ইংল্যান্ডের রাজা/রানী কর্তৃক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এবং ভারত সচিবের সুপারিশক্রমে তিনি ৫ বছরের জন্য নিযুক্ত হতেন। ভারতীয় আইন ও আদালতে বিচারের ঊর্ধ্বে ছিলেন তিনি। তিনি ব্রিটিশ সরকারের প্রেরিত নির্দেশনামা অনুযায়ী ভারতবর্ষ শাসন করতেন। তিনি ভারতের রাজস্ব থেকে বার্ষিক ২,৫০,৮০০ টাকা বেতন পেতেন ।

→ গভর্নর জেনারেলের ক্ষমতা : ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন অনুযায়ী এ শাসনব্যবস্থার মূলস্তম্ভ ছিলেন গভর্নর জেনারেল । তিনি অপ্রতিহত ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। অনেকে গভর্নর জেনারেলকে অতিরঞ্জিত ক্ষমতা দেয়ার ফলে এ আইনের কার্যকারিতা ব্যর্থ বলে মতামত ব্যক্ত করেন ।

১. গভর্নর জেনারেলের প্রশাসনিক ক্ষমতা ও কার্যাবলি : ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন অনুযায়ী গভর্নর জেনারেলকে প্রশাসনিক ক্ষেত্রে ৩টি বিশেষ ক্ষমতা দেয়া হয় ।

(ক) গভর্নর জেনারেলের স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা : ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন অনুযায়ী গভর্নর জেনারেল মন্ত্রীদের সাথে পরামর্শ না করে তার বিশেষ ক্ষমতাবলে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারতেন। সেগুলো গভর্নর জেনারেলের স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা বলে পরিচিত। এগুলোর মধ্যে প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র, ধর্ম, উপজাতীয় এলাকা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য । তিনি তার ক্ষমতাবলে তার উপদেষ্টা, পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সদস্য, চীফ কমিশনার, হাইকোর্ট ও ফেডারেল কোর্টের বিচারপতিদের নিয়োগ দিতে পারতেন। সংরক্ষিত যে কোনো বিচারে তিনি ৩ জন উপদেষ্টার পরামর্শ ও সহায়তা নিতেন। উপদেষ্টাগণকে তিনি নিয়োগ করতেন। উপদেষ্টাগণ তাদের কাজের জন্য গভর্নর জেনারেলের কাছে দায়ী থাকতেন। তিনি ছিলেন ভারতের স্থল, নৌ ও বিমান বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। এ ক্ষমতাবলে তিনি তিন বাহিনীর প্রধান এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নিয়ন্ত্রণ করতেন।

(খ) ব্যক্তিগত বিবেচনাধীন ক্ষমতা ও বিশেষ দায়িত্ব : যেসব বিষয়ে গভর্নর জেনারেল মন্ত্রিসভার সাথে পরামর্শ করলেও সে উপদেশ বা পরামর্শ অগ্রাহ্য করে স্বীয় বিচারবুদ্ধি অনুসারে কাজ করতে পারতেন। এগুলো ছিল তার ব্যক্তিগত বিবেচনাধীন ক্ষমতার আওতাভুক্ত। যেসব বিষয়ে গভর্নর জেনারেল স্বীয় বিবেচনাধীন ক্ষমতা কার্যকর করতেন এবং বিশেষ দায়িত্ব ভোগ করতেন সেগুলো নিম্নরূপ :

১. ভারত বা কোনো অংশের শান্তিশৃঙ্খলার প্রতি হুমকি দেখা দিলে তা রোধ করা ।

২. কেন্দ্রীয় সরকারের আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। ৩. সংখ্যালঘুদের স্বার্থ ও নিরাপত্তা বিধান করা ।

৪. সরকারি কর্মচারীদের আইনসঙ্গত অধিকার এবং বৈধ স্বার্থ রক্ষাণাবেক্ষণ করা ।

৫. বৈষম্যের হাত থেকে ভারতের ব্রটিশদের স্বার্থ রক্ষা করা। ৬. বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে অসমতা প্রতিরোধ করা।

৭. ভারতের দেশীয় রাজ্যগুলোর অধিকার এবং তার শাসকদের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা করা।

(গ) মন্ত্রিসভার পরামর্শক্রমে ব্যবহৃত ক্ষমতা : গভর্নর জেনারেল যেসব বিষয়ে মন্ত্রিসভার পরামর্শ নিতেন সেগুলো ছিল এ ধরনের ক্ষমতার আওতাভুক্ত। হস্তান্তরিত বিষয় পরিচালনার ক্ষেত্রে তিনি মন্ত্রিসভার পরামর্শ নিতেন। তিনি তার মন্ত্রিদের নিয়োগ ও বরখাস্ত করতে পারতেন। কেন্দ্রীয় আইনসভার সদস্যদের আস্থা অর্জনে সমাস ব্যক্তিদের মধ্য থেকে তিনি অনধিক ১০ জন মন্ত্রী নিয়োগ করতেন এবং তাদের মধ্যে দপ্তর বণ্টন করতেন ।

২. আইন প্রণয়ন সংক্রান্ত ক্ষমতা ও কার্যাবলি : আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে গভর্নর জেনারেলের হাতে প্রভূত পরিমাণ ক্ষমতা ছিল। তিনি ছিলেন আইন প্রণয়ন ব্যবস্থার শিরোমণি। তিনি র আইনসভার অধিবেশন আহ্বান, মূলতবি এবং ভেঙে দিতে পারতেন । তিনি আইনসভায় বক্তৃতা প্রদান বা বাণী প্রেরণ করতে পারতে। কেন্দ্রীয় আইনসভা কর্তৃক গৃহীত বিলে তিনি সম্প্রত্তি জ্ঞাপন কিংবা সম্মতি দানে বিরত থাকা কিংবা রাজকীয় অনুমোদনের জন্য সংরক্ষিত রাখা অথবা পুনর্বিবেচনার জন্য ফেরত পাঠাতে পারতেন।

গভর্নর জেনারেল যদি মনে করতেন ভারত বা এর কোনো অংশের শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার্থে তার বিশেষ দায়িত্ব পালনে বিঘ্ন ঘটাতে পারে, তাহলে তিনি তার বিশেষ স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতাবলে 3 কোনো বিল বা বিলের ধারা বা সংশোধনীর আলোচনা বন্ধ করে ন দিতে পারতেন। গভর্নর জেনারেলের পূর্বানুমতি ছাড়া কেন্দ্রীয়

.আইন পরিষদে গভর্নর জেনারেল বা প্রাদেশিক গভর্নর কর্তৃক ল প্রণীত কোনো জরুরি আইন বা ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ভারত সংক্রান্ত কোনো আলোচনা বা সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন করা যেত না

প্রয়োজনে গভর্নর জেনারেল শর্তসাপেক্ষে তার স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতাবলে ৬ মাসের জন্য জরুরি আইন প্রণয়ন এবং গভর্নর জেনারেলের আইন বিধিবদ্ধ করতে পারতেন। কেন্দ্রীয় সরকার পরিচালনায় শাসনতান্ত্রিক সংকট দেখা দিলে তিনি তার সেচ্ছাধীন ক্ষমতা বলে একটি ঘোষণা দ্বারা সরকার পরিচালনা করতে পারতেন। দেশে আর্থিক সংকট বা আইনশৃঙ্খলার অবনতির প্রেক্ষিতে তিনি ন জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে পারতেন। তাই বলা যায় আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে গভর্নর জেনারেলের ক্ষমতা অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছিল ।

৩. অর্থসংক্রান্ত ক্ষমতা ও কার্যাবলি : আর্থিক দিক দিয়ে গভর্নর জেনারেল ছিলেন চূড়ান্ত ক্ষমতার মালিক। প্রতি বছর তিনি আইনসভার উভয়পক্ষে যুক্তরাজ্যের বার্ষিক বাজেট পেশ করার ব্যবস্থা করতেন। এ বাজেটে ভোগযোগ্য এবং ভোগ বহির্ভূত বিষয় অন্তভুক্ত থাকত। ভোট বহির্ভূত বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল গভর্নর জেনারেল, মন্ত্রি পরিষদের সদস্যদের, বিচারকবৃন্দ, এ্যাডভোকেট জেনারেল অর্থনৈতিক উপদেষ্টা, প্রভৃতি রাজস্ব, কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা এবং প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বরাদ্দ ইত্যাদি। ভোটযোগ্য বিষয়গুলো গভর্নর জেনারেলের অনুমোদন সাপেক্ষে কেন্দ্রীয় আইনসভায় পেশ করা হতো। তার পূর্ব অনুমতি ছাড়া আইনসভায় কোনো অর্থ বিল বা মঞ্জুরি দাবি প্রত্যাখ্যান করা হলেও গভর্নর জেনারেল তা পুনঃস্থাপন করতে পারতেন। অর্থনৈতিক দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারের আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার দায়িত্বও তার ছিল, রিজার্ভ ব্যাংকের গভর্নরের মাধ্যমে তিনি মুদ্রা ও কাগজি মুদ্রার উপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতেন। রিজার্ভ ব্যাংকের গভর্নরকে তিনি নিয়োগ করতেন। গভর্নর জেনারেল অর্থমন্ত্রীর যে কোনো সিদ্ধান্ত নাকচ করে দিতে পারতেন।

৪. প্রাদেশিক নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা : প্রাদেশিক ক্ষেত্রেও গভর্নর জেনারেল যথেষ্ট কর্তৃত্ব বা নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন । প্রাদেশিক গভর্নর বা গভর্নরের নির্দেশনুযায়ী কাজ করতেন। শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার্থে তিনি প্রাদেশিক সরকারের উপর যে কোনো আদেশ জারি করতে পারতেন । প্রাদেশিক গভর্নর যখন তার ইচ্ছাধীন ও ব্যক্তিগত বিচার বিবেচনা অনুযায়ী কাজ করতেন, তখন তিনি গভর্নর জেনারেলের কাছে দায়ী থাকতেন। জরুরি অবস্থাকালে প্রাদেশিক গভর্নর প্রাদেশিক বিষয়সমূহের ক্ষেত্রেও আইন প্রণয়ন করতে পারতেন ।

৫. জরুরি অবস্থাকালীন ক্ষমতা : গভর্নর জেনারেল ভারতের শান্তিশৃঙ্খলা বিধান বা কোনো অর্থনৈতিক দুরবস্থা দেখা দিলে প্রয়োজনে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে পারতেন। এ জরুরি অবস্থা ঘোষণা করার সময় তিনি অবস্থা উপলব্ধি করে ফেডারেল কোর্টের ক্ষমতা স্বহস্তে গ্রহণ করতে পারতেন।

→ সমালোচনা : ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনে যেসব পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল তা প্রশংসনীয় ছিল বলা যায়। তবে এ আইন সমালোচনা উর্ধ্বে ছিল না। এ আইনে গভর্নরের হাতে এত বেশি ক্ষমতা দেয়া হয় যে, প্রাদেশিক শাসন পরিচালনায় গভর্নর জেনারেলের নিয়ন্ত্রণ ছিল। ফলে প্রাদেশিক স্বায়ত্ত্বশাসন প্রহসনে পরিণত হয়। আইনের ৯৩ নং ধারা বলে গভর্নর প্রাদেশিক আইনসভা ভেঙে দিতে এবং নিজ হাতে ক্ষমতা নিতে পারতেন। অথচ ভারত শাসন আইন পাস করার সময় বড় বড় বুলি শোনানো হয় এবং বলা হয় যে, ভারতীয়দের জন্য মহতি পুরস্কার হিসেবেই প্রাদেশিক স্বায়ত্ত্বশাসনের উপস্থাপন ঘটেছিল। এ আইনের সমালোচনা করতে গিয়ে অনেকে বলেছেন, এ আইনটি ভারতে সাম্রাজ্যবাদী রাজনীতির প্রকৃষ্ট উদাহরণ । কংগ্রেস সভাপতি জহরলাল নেহেরু এ আইন সম্পর্কে মন্তব্য করেন- The new indian constitution was a machine with strong brake and no engine’. মুসলিম লীগ সভাপতি আইনের সমালোচনা করে বলেছেন, The scheme of 1935 was throughtly rotten fundamentally bad and tatally unacesptable. পণ্ডিত M.M Malaviya বলেছেন, নতুন আইনটি আমাদের উপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। বাহ্যিকভাবে এটা কিছুটা গণতান্ত্রিক প্রকৃতির হলেও ভিতর থেকে আইনটি ছিল সম্পূর্ণ ফাঁপা। তাই বলা যায়, ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনে ভারতীয়দের সন্তুষ্ট করার জন্য কিছু করা হয়নি। কেবল গভর্নরের হাতে অধিক ক্ষমতা দিয়ে প্রাদেশিক শাসন পরিচালনায় জটিলতা সৃষ্টি করা হয় মাত্র। তবে এতকিছুর মধ্যে গভর্নর জেনারেলের ক্ষমতার কিছুটা অতিরঞ্জিত থাকলেও ভারতবাসীর জন্য কিছু মূল্যবান আইনও রয়েছে ।

উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, ভারতবাসীর জনমতের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক যে সকল আইন প্রণীত হয় তা ছিল অনেকটা ভারতবাসীকে ভেলকিবাজি দেখানোর সমতুল্য। কেননা দেখা যায় যে, ভারতবাসীর স্বার্থে একই অবস্থার প্রেক্ষাপটে ১৯০৯, ১৯১৯, ও শেষে ১৯৩৫ সালেও আইন পাস করা হয়। কিন্তু দেখা যায় যে, প্রতিক্ষেত্রে শুধু ভারতবাসীকে শোষণ করার কৌশল প্রয়োগ করা হয় মাত্র । যেমন দেখা যায়, ১৯৩৫ সালে যে গভর্নর জেনারেল নিয়োগ করা হয় তা ছিল অতিরঞ্জিত ব্যবস্থা মাত্র এ ব্যবস্থায় আদৌ গভর্নর জেনারেলকে এত ক্ষমতা দেয়ার প্রয়োজনীয়তা ছিল না। ফলে বিভিন্ন কারণে এ আইন ব্যর্থ হয় ।