― Advertisement ―

spot_img

১৯৪৭ সালে ভারত কেন বিভক্ত হয়েছিল? এই বিভক্তি কি অপরিহার্য ছিল?

অথবা, ১৯৪৭ সালের ভারত বিভক্তির প্রেক্ষাপট আলোচনা কর। ভূমিকা : পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো শাসনই চিরস্থায়ী নয়। যার শুরু আছে তার শেষও আছে। তবে কারো কারো...
Homeদক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের প্রতিক্রিয়া ও ফলাফল সম্বন্ধে আলোচনা কর ।

১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের প্রতিক্রিয়া ও ফলাফল সম্বন্ধে আলোচনা কর ।

ভূমিকা : বঙ্গভঙ্গ বাংলার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় । ভারতের ভাইসরয় লর্ড কার্জনের আদেশে ১৯০৫ সালের ১৩ই অক্টোবর বঙ্গভঙ্গ সম্পন্ন হয়। তবে এ ধারণাটি কার্জন থেকে শুরু হয়নি। ১৭৬৫ সাল পরবর্তী বাংলা, বিহার, উড়িষ্যাসহ সরকারি প্রশাসনিক এলাকা হিসেবে বাংলা অনেক বড় হয়ে যায়। ফলে ব্রিটিশ সরকারের পক্ষে এটির সুষ্ঠু শাসন প্রক্রিয়া অত্যন্ত দুরূহ হয়ে পড়ে। বঙ্গভঙ্গের সূত্রপাত এখান থেকেই, আবার ১৯১১ সালে তা রহিত হয় । যার ফলাফল ছিল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী।

→ বঙ্গভঙ্গের ফলে হিন্দু-মুসলমানের প্রতিক্রিয়া : ১৯০৫ সালের ঘোষিত বঙ্গভঙ্গের ফলে ভারতীয় উপমহাদেশের ১৯০৫ সালের ঘোষিত বঙ্গভঙ্গের ফলে ভারতীয় উপমহাদেশের হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায় । নিম্নে বঙ্গভঙ্গের ফলে হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে সৃষ্ট প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে আলোচনা উপস্থাপন করা হলো-

১. মধ্যবিত্ত বাঙালি হিন্দু ও বর্ণ হিন্দুদের প্রতিক্রিয়া : মধ্যবিত্ত ও উচ্চ বর্ণের হিন্দুসম্প্রদায় ১৯০৩ সালে বঙ্গভঙ্গ প্রস্তাব প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই এর বিরোধিতা শুরু করে । কলকাতা কেন্দ্রিক সকল শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ও উচ্চ বর্ণের হিন্দুরা বিশেষ করে জমিদার, রাজনীতিবিদ, শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, আইনজীবী ও সাংবাদিক সবাই বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে যোগ দেয়। তারা বঙ্গভঙ্গকে জাতীয় সংহতি ও রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রতি আঘাত বলে অভিহিত করেন। হিন্দু নেতৃবৃন্দ একে বাঙালি বিরোধী, জাতীয়তাবাদ বিরোধী ও বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদ প্রভৃতি বিশেষণে আখ্যায়িত করেন। তারা মনে করেন এর দ্বারা মুসলমানদের প্রধান্য প্রতিষ্ঠিত হবে এজন্য যেকোনো মূল্যে হিন্দু সম্প্রদায় বঙ্গভঙ্গকে রুখে দিতে সর্বদা সচেষ্ট ছিলেন এবং তাদের দাবির মুখে ১৯১১ সালে মাত্র ৬ বছরের মাথায় ব্রিটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গ রদ ঘোষণা করতে বাধ্য হয় ।

২. নিম্ন বর্ণের হিন্দুদের প্রতিক্রিয়া : উচ্চ বর্ণের হিন্দুরা বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করলেও নিম্নবর্ণের হিন্দুরা বঙ্গভঙ্গকে স্বাগত জানায়। বাংলায় হিন্দুসম্প্রদায়ের মধ্যে নমশূদ্র ছিল সংখ্যা গরিষ্ঠ । হিন্দু ব্রাহ্মণ, বৈশ্য ও কায়স্থদের ঘৃণার ফলে তারা ছিল । অনগ্রসর। বর্ণ হিন্দুদের রাজনৈতিক অভিলাষের মধ্যে তারা কোনো স্বার্থ খুঁজে পায়নি। তাই তারা বঙ্গভঙ্গ সমর্থন করে ।

৩. মুসলমানদের প্রতিক্রিয়া : বাংলার মুসলমানরা বঙ্গভঙ্গকে স্বাগত জানান। এটি ছিল এ অঞ্চলের মানুষের জন্য আশির্বাদস্বরূপ। ১৯০৫ সাল থেকে যখন হিন্দু সম্প্রদায় বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধ প্রবল আন্দোলন গড়ে তোলে তখন ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহ বঙ্গভঙ্গের পক্ষে মুসলিম জনমত গঠনে ভূমিকা রাখেন। মুসলিম নেতৃবৃন্দ লক্ষ্য করলেন যে হিন্দু নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস কখনো মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষার জন্য কাজ করবে না। এজন্য ১৯০৬ সালে মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র রাজনৈতিক দল মুসলিম লীগ গঠন করা হয়। বঙ্গভঙ্গের ফলে বাংলায় আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগে। ঢাকা নতুন প্রদেশের রাজধানী হওয়ায় সেখানে অফিস, আদালত ও সুরম্য অট্টালিকা গড়ে উঠে। বিভিন্ন শিল্পকারখানা স্থাপন করা হয়। শিক্ষাদীক্ষার ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয়। বলতে গেলে ঢাকা কলকাতার সমকক্ষতা অর্জন করে। বাংলার সামগ্রিক উন্নতির ফলে বাংলার জনসাধারণ বঙ্গভঙ্গকে স্বাদরে গ্রহণ করেন।

→ বঙ্গভঙ্গের ফলাফল : ১৯০৫ সালে ব্রিটিশ সরকারের গভর্নর লর্ড কার্জন কর্তৃক ঘোষিত বঙ্গভঙ্গ বাংলার জনগণের জন্য সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, শিক্ষা ও সংস্কৃতিসহ প্রভৃতি ক্ষেত্রে যুগান্ত কারী পরিবর্তন এনে দেয়। এজন্য বাংলার জনগণ বঙ্গভঙ্গকে স্থানরে গ্রহণ করে। ১৯০৬ সালের ১৬ই অক্টোবর বঙ্গভঙ্গের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে ইস্টার্ন বেঙ্গল এন্ড আসামের ‘ইরা’ পত্রিকায় বঙ্গভঙ্গের ৮টি সুবিধার কথা উল্লেখ করে। সেগুলো নিম্নরূপ :

১. ঢাকা নগরের পুনর্জন্ম ও চট্টগ্রাম বন্দরের উন্নতি ।

২. নদী ও খালগুলোর উন্নতি, রেললাইনের সম্প্রসারণ, চট্টগ্রামের সাথে সংযোগ স্থাপন ।

৩. নতুন প্রাদেশিক পরিষদ গঠিত হওয়ার ফলে জমিদার ও সাধারণ মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রতিনিধিদের পক্ষে জনসাধারণের অভাব অভিযোগের প্রতি সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করার সুযোগ-সুবিধা। ৪. সুষ্ঠু শাসন ও জনগণের জানমালের নিরাপত্তা ।

৫. পূর্ব বাংলার শিক্ষিত ও সভ্য লোকদের সংস্পর্শে আসায় অনুন্নত আসামের অধিবাসীদের উপকার ।

৬. পূর্ব বাংলার জন্য কর্মদক্ষ পুলিশ বাহিনী গঠন।

৭. বাংলা প্রদেশে শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি সাধন ।

৮. দেশের জনসাধারণ প্রদেশের প্রধান কর্মকর্তার সংস্পর্শে আসতে সক্ষম হয়।

উপসংহার : পরিশেষে বলা যায়, বঙ্গভঙ্গের উদ্যেগ প্রথমে ছিল প্রশাসনিক পরে রাজনৈতিক কারণই প্রাধান্য লাভ করে। বঙ্গভঙ্গ বাংলার জনগণের জন্য আশির্বাদস্বরূপ ছিল। এর ফলে বাংলার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অগ্রগতি সাধিত হয়। বঙ্গভঙ্গ ও এর রদ মুসলমানদের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি করে। মুসলমানরা উপলব্ধি করে যে ব্রিটিশ সরকারের হাতে মুসলমানদের অধিকার অক্ষুণ্ণ থাকতে পারে না । বঙ্গভঙ্গ ও এর রদ বাংলার মানুষকে বিপ্লবী চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে এবং নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে শিক্ষা দেয় ৷