― Advertisement ―

spot_img

১৯৪৭ সালে ভারত কেন বিভক্ত হয়েছিল? এই বিভক্তি কি অপরিহার্য ছিল?

অথবা, ১৯৪৭ সালের ভারত বিভক্তির প্রেক্ষাপট আলোচনা কর। ভূমিকা : পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো শাসনই চিরস্থায়ী নয়। যার শুরু আছে তার শেষও আছে। তবে কারো কারো...
Homeদক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের কারণ ও ফলাফল আলোচনা কর।

১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের কারণ ও ফলাফল আলোচনা কর।

ভূমিকা : ব্রিটিশ ভারত ও বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে বঙ্গভঙ্গ একটি অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। ১৯০৫ সালে ভারতের তৎকালীন বড়লাট লর্ড জর্জ নাথানিয়েল কার্জন বাংলা প্রদেশ ভাগ করেন। যা ইতিহাসে বঙ্গভঙ্গ নামে পরিচিত। বঙ্গভঙ্গের ফলে ‘পশ্চিমবঙ্গ’ ও ‘পূর্ববঙ্গ’ নামে নতুন দুটি প্রদেশ গঠিত হয়। বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার সমন্বয়ে গঠিত পূর্ববঙ্গের সাথে মালদা জেলার চিফ কমিশনার শাসিত আসামের সঙ্গে সংযুক্ত করে পূর্ব বাংলা ও আসাম নামে একটি নতুন প্রদেশ গঠন করা হয়। যেটি ইতিহাসে ‘বঙ্গ’ নামে পরিচিতি লাভ করে। বঙ্গভঙ্গ ও এর পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনাবলি ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে। বঙ্গভঙ্গ ও রদকে কেন্দ্র করে বাংলার প্রধান দুটি ধর্মীয় সম্প্রদায় হিন্দু ও মুসলমানের দীর্ঘদিনের গড়ে ওঠা ঐক্যের বিপরীতে অনৈক্যের সূত্রপাত ঘটে ।

→ বঙ্গভঙ্গ : ১৮৯৮ সালে লর্ড কার্জন ভারতের বড়লাট হিসেবে কার্যভার গ্রহণ করেন। লর্ড কার্জনের শাসনকালের মধ্যে সর্বাপেক্ষা তাৎপর্যপূর্ণ সংস্কার হলো বঙ্গভঙ্গ। তৎকালে সমগ্র বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা, মধ্য প্রদেশ ও আসামের কিছু অংশ নিয়ে ছিল বঙ্গ প্রদেশ বা বাংলা প্রেসিডেন্সি। প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য লর্ড কার্জন ১৯০৩ সালে এই বিরাট প্রদেশকে দুইভাগে ভাগ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন । তিনি উত্তর ও পূর্ব বাংলাকে আসামের সাথে সংযুক্ত করে একটি নতুন প্রদেশ সৃষ্টি করেন। এই নবগঠিত প্রদেশের নামকরণ করেন পূর্ব বাংলা ও আসাম। অপরদিকে পশ্চিম বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার সমন্বয়ে আরেকটি প্রদেশ গঠিত হয় । যার নাম দেওয়া হয় ‘বাংলা প্রদেশ’ (Bangla Presidency). ১৯০৫ সালের ১৬ই অক্টোবর থেকে বঙ্গভঙ্গ আইন কার্যকর হয়।

→ বঙ্গভঙ্গের কারণ : বঙ্গভঙ্গের কারণ বিশ্লেষক ঐতিহাসিকরা দুটি বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। ব্রিটিশ সরকারের কর্তাব্যক্তিরা বঙ্গভঙ্গের প্রধান কারণ হিসেবে প্রশাসনিক কারণকে উল্লেখ করলেও এর পিছনে রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনেতিক কারণও বিদ্যমান । নিচে বঙ্গভঙ্গের কারণগুলো আলোচনা করা হলো :

১. প্রশাসনিক কারণ : ব্রিটিশ সরকারের বঙ্গভঙ্গের উদ্যোগ নেয়ার পিছনে প্রশাসনিক কারণ হলো :

(ক) বাংলা প্রদেশের আয়তনের বিশালতা : ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ মনে করেন যে, বাংলা একটি বিশাল প্রদেশ। বিভক্তির আগে বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা, মধ্য প্রদেশ ও আসামের কিছু অংশ নিয়ে বাংলা প্রদেশ ছিল। এটি ছিল আয়তন ও জনসংখ্যার দিক দিয়ে

সবচেয়ে বড় প্রদেশ। এর আয়তন ছিল ১ লক্ষ ৮৯ হাজার বর্গমাইল এবং ১৯০১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী এর জনসংখ্যা ছিল ৭ কোটি ৫০ লক্ষ ।

একজন গভর্নরের পক্ষে এত বিশাল সাম্রাজ্য পরিচালনা করা দুরূহ হয়ে পড়ে। এজন্য প্রশাসনিক সুবিধার কথা বিবেচনা করে ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ করা হয় ।

(খ) বঙ্গ প্রদেশে শান্তি শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা : পূর্ব বাংলার যোগাযোগ, পুলিশ ও ডাক ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত নিম্নমানের। অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে দক্ষিণ ও পূর্ব বাংলার বিস্তীর্ণ চর ও হাওড়ে প্রতিনিয়ত চুরি, ডাকাতি ও বেআইনি কর্মকাণ্ড হতে থাকে। বাংলাকে এসব অরাজক পরিস্থিতি থেকে মুক্ত করে শান্তি শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য ব্রিটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গের উদ্যোগ গ্রহণ করেন

২. রাজনৈতিক কারণ : বেশির ভাগ ভারতীয় ঐতিহাসিক রাজনৈতিক উদ্দেশ্যকে বঙ্গভঙ্গের প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বঙ্গভঙ্গের পিছনে যেসব রাজনৈতিক কারণ বিদ্যমান ছিল তা হলো :

(ক) বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা ধ্বংস করা : কলকাতা কেন্দ্রিক বাঙালি জাতীয়তাবাদের শক্ত ভিত গড়ে উঠে। বিশেষ করে ১৮৮৫ সালে ভারতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার পর থেকে তা আরো সুদৃঢ় হতে থাকে। ব্রিটিশ সরকার মনে করে জাতীয়তাবাদী এ শক্তিকে নস্যাৎ করে দিতে পারলে বাঙালির শক্তি ক্ষীণ হয়ে যাবে । এই ভেবে সরকার বঙ্গভঙ্গের উদ্যোগ গ্রহণ করেন ।

(খ) কংগ্রেসকে দুর্বল করা : ১৮৮৫ সালে ভারতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ভারতবাসীর মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। কংগ্রেস নেতৃবৃন্দের রাজনৈতিক সচেতনতা ব্রিটিশ সরকারকে সঙ্কিত করে তুলে এবং বঙ্গভঙ্গের মাধ্যমে কংগ্রেসকে দ্বিধাবিভক্ত করে এর শক্তি হ্রাস করে।

(গ) বিভক্ত ও শাসননীতি : বঙ্গভঙ্গের অন্যতম কারণ ছিল ব্রিটিশ সরকারের ‘বিভক্ত ও শাসননীতি’র (Divide and Rule Policy) অন্যতম একটি অংশ। ভারতে ব্রিটিশ রাজশক্তিকে শক্তিশালী করা ও বাঙালিদের শক্তি ক্ষীণ করার জন্য দুই বাংলাকে বিভক্ত করা নীতি অবলম্বন করা হয়।

৩. অর্থনৈতিক কারণ : বঙ্গভঙ্গের পিছনে ব্রিটিশ সরকারের অর্থনৈতিক কারণগুলো নিম্নরূপ :

(ক) অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীভূত করা : অবিভক্ত বাংলা বাংলার রাজধানী হিসেবে ব্যবসা-বাণিজ্য সবকিছু কলকাতা কেন্দ্রিক হওয়ায় বাংলা প্রদেশ অর্থনৈতিক দিক দিয়ে অনেক পিছিয়ে পড়ে। এজন্য বাংলায় অর্থনৈতিক বিকাশ সাধন, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধনের জন্য বঙ্গভঙ্গ করা হয়। (খ) জমিদারদের অত্যাচার থেকে রায়তদের মুক্তি কলকাতা কেন্দ্রিক আধুনিক সভ্যতার বিকাশ সাধনের ফলে বাংলার অধিকাংশ জমিদার কলকাতায় বসবাস করা শুরু করে। তাদের অনুপস্থিতিতে তাদের নিযুক্ত নায়েব, গোমস্তারা রায়ত দিয়েছিল তথা প্রজাদের উপর নানাভাবে অত্যাচার করতো। প্রজাদের এমন অত্যাচার থেকে মুক্ত করার জন্য ও তাদের অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা আনয়নের জন্য বঙ্গভঙ্গ করা হয়।

৪. সামাজিক ও ধর্মীয় কারণ : ব্রিটিশ শাসনের শুরু থেকে তাদের বৈষম্যমূলক আচরণের ফলে মুসলমানরা ধীরে ধীরে সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রাধান্য হারাতে থাকে। তাছাড়া স্মরণাতীতকাল থেকে পূর্ব বাংলায় মুসলমানদের ও পশ্চিম বাংলায় হিন্দুদের প্রাধান্য বিরাজমান ছিল। এজন্য ব্রিটিশ সরকার ভারতীয়দের সামাজিক ও ধর্মীয় বিষয় বিবেচনা করে বঙ্গভঙ্গের জন্য উদ্যোগী হয় ।

→ বঙ্গভঙ্গের ফলাফল : ১৯০৫ সালে ব্রিটিশ সরকারের গভর্নর লর্ড কার্জন কর্তৃক ঘোষিত বঙ্গভঙ্গ বাংলার জনগণের জন্য সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, শিক্ষা ও সংস্কৃতিসহ প্রভৃতি ক্ষেত্রে যুগান্ত কারী পরিবর্তন এনে দেয়। এজন্য বাংলার জনগণ বঙ্গভঙ্গকে স্বাদরে গ্রহণ করে। ১৯০৬ সালের ১৬ই অক্টোবর বঙ্গভঙ্গের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে ইস্টার্ন বেঙ্গল এন্ড আসামের ‘ইরা’ পত্রিকায় বঙ্গভঙ্গের ৮টি সুবিধার কথা উল্লেখ করে । সেগুলো নিম্নরূপ:

১. ঢাকা নগরের পুনর্জন্ম ও চট্টগ্রাম বন্দরের উন্নতি । ২. নদী ও খালগুলোর উন্নতি, রেললাইনের সম্প্রসারণ, চট্টগ্রামের সাথে সংযোগ স্থাপন।

৩. নতুন প্রাদেশিক পরিষদ গঠিত হওয়ার ফলে জমিদার ও সাধারণ মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রতিনিধিদের পক্ষে জনসাধারণের অভাব অভিযোগের প্রতি সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করার সুযোগ-সুবিধা ৷ ৪. সুষ্ঠু শাসন ও জনগণের জানমালের নিরাপত্তা ৷

৫. পূর্ব বাংলার শিক্ষিত ও সভ্য লোকদের সংস্পর্শে আসায়

অনুন্নত আসামের অধিবাসীদের উপকার ।

৬. পূর্ব বাংলার জন্য কর্মদক্ষ পুলিশ বাহিনী গঠন ৷

৭. বাংলা প্রদেশে শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি সাধন ৷

৮. দেশের জনসাধারণ প্রদেশের প্রধান কর্মকর্তার সংস্পর্শে নবগঠিত আসতে সক্ষম হয়।

উপসংহার : পরিশেষে বলা যায়, বঙ্গভঙ্গের উদ্যেগ প্রথমে ছিল প্রশাসনিক পরে রাজনৈতিক কারণই প্রাধান্য লাভ করে। বঙ্গভঙ্গ বাংলার জনগণের জন্য আশির্বাদস্বরূপ ছিল। এর ফলে বাংলার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অগ্রগতি সাধিত হয়। বঙ্গভঙ্গ ও এর রদ মুসলমানদের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি করে। মুসলমানরা উপলব্ধি করে যে ব্রিটিশ সরকারের হাতে মুসলমানদের অধিকার অক্ষুণ্ণ থাকতে পারে না। বঙ্গভঙ্গ ও এর রদ বাংলার মানুষকে বিপ্লবী চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে এবং নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে শিক্ষা দেয়।