― Advertisement ―

spot_img

১৮৯২ সালে কাউন্সিল আইনের ধারাসমূহ উল্লেখ কর।

ভূমিকা : ১৮৯২ সালের ভারতীয় কাউন্সিল আইনের দ্বারা জাতীয়দের দাবিদাওয়ার একটা বিশেষ দিক বাস্তবায়নের অগ্রগতি সাধন হয়। ভারতীয় উপমহাদেশের শাসনতান্ত্রিক ক্রমবিকাশের ধারায় ১৮৯২ সালের...
Homeঔপনিবেশিক শাসক১৮৬১ সালের কাউন্সিল আইনের ধারাসমূহ উল্লেখ কর।

১৮৬১ সালের কাউন্সিল আইনের ধারাসমূহ উল্লেখ কর।

ভূমিকা : ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশদের শাসন নামক শোষণ নীতির কারণ ক্রমান্বয়ে জন অসন্তোষ দেখা যায়। না যার কারণে ১৮৫৭ সালে মহাবিদ্রোহ ঘটে। অতঃপর ১৮৫৮ সালে। ভারত শাসন আইন প্রণয়ন করা হলে সেখানেও ভারতবাসীর দাবিদাওয়ার প্রতি পৃষ্ঠ প্রদর্শন করা হয়। যার কারণে কেন্দ্রীয় আইনসভায় ভারতীয় প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্তির জন্য ভারতীদের দাবি | জোরালো হয়ে উঠে। এমতবস্থায় ভারতীয় জনসন্তুষ্টির কারণে অনুসন্ধানের জন্য ভারতীয় আইনসভায় ভারতীয় সদস্য অন্তর্ভুক্তির ব্যবস্থা এবং পূর্ববর্তী আইনসমূহের ভুলসমূহ দূর করার জন্য ১৮৬১ সালে ভারতীয় কাউন্সিল আইন পাশ করে।

— ১৮৬১ সালের আইনের ধারা বা বৈশিষ্ট্য : নিম্নে ১৮৬১ সালের আইনের ধারা বা বৈশিষ্ট্যগুলো আলোচনা করা হলো :

১. ১৮৬১ সালের ভারতীয় কাউন্সিল আইনে গভর্নর জেনারেলের পরিষদকে আরো সম্প্রসারণ করা হয়। এক্ষেত্রে গভর্নর জেনারেলের শাসন পরিষদ সদস্য সংখ্যা ৫ জনে উন্নীত করা হয়।

২. এ আইনে গভর্নর জেনারেলের পরিষদের কার্যাবলিকে সরাসরি দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়। অর্থাৎ শাসন বিভাগকে আইন বিভাগ থেকে পৃথক করে দুটি স্বতন্ত্র বিভাগে পরিণত করা হয় ।

৩. ১৯৬১ সালের ভারতীয় কাউন্সিল আইনে গভর্নর জেনারেলের শাসন বিভাগীয় কার্যাবলি পরিচালনার ভার সম্পূর্ণরূপে | গভর্নর জেনারেলের শাসন পরিষদের উপর ন্যস্ত করা হয় ।

৪. এ আইনে ভারতীয় আইনসভার কাজকর্ম একমাত্র আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়।

৫. শাসন পরিষদের প্রশাসনিক কার্যাবলিতে এমনকি অর্থ সংক্রান্ত ব্যাপারেও আইনসভা কোনোরূপ হস্তক্ষেপ করতে পারবে না বলে স্থির করা হয়।

৬. আইন পরিষদ কর্তৃক পাসকৃত যেকোনো আইনকে প্রয়োজনবোধে নাকচ করার ক্ষমতা গভর্নর জেনালেকে দেয়া হয় ।

৭. সর্বোপরি ১৮৬১ সালের ভারতীয় কাউন্সিল আইনে গভর্নর জেনারেল বা বড়লাটকে জরুরি পরিস্থিতিতে আইন পরিষদের অনুমোদন ব্যতিরেকেও অর্ডিন্যান্স বা জরুরি বিধি বা অধ্যাদেশ প্রণয়নের ক্ষমতা দেয়া হয়। তবে এ বিধি মাত্র ৬ মাসকাল বলবৎ থাকবে বলে এ আইনে উল্লেখ করা হয়।

৮. এ আইনে আইন বিষয়কে কাজের জন্য গভর্নর জেনারেলের পরিষদের সদস্য সংখ্যা ৬ জনে উন্নীত করা হয়। এক্ষেত্র শাসন বিভাগের ৫ জন সদস্য ব্যতীত অতিরিক্ত একজন সদস্যকে আইন প্রণয়নের জন্য নিযুক্ত করার ব্যবস্থা করা হয় । তবে গভর্নর জেনারেল তার নিজস্ব বিচার-বিবেচনা মোতাবেক প্রয়োজনবোধে এ সদস্য সংখ্যা সর্বনিম্ন ৬ জন থেকে সর্বোচ্চ ১২ জনে উন্নীত করতে পারবেন বলে উল্লেখ করা হয় ।

৯. গভর্নর জেনারেলের সম্প্রসারিত পরিষদের অর্ধেক সদস্য বেসরকারি স্তর থেকে গভর্নর জেনারেল কর্তৃক মনোনীত হবে এবং এক্ষেত্রে কিছু মর্যাদাসম্পন্ন ভারতীয়কে গভর্নর জেনারেল কর্তৃক গ্রহণের ব্যবস্থা করা হয়। এ বেসরকারি সদস্যদের কার্যকাল হবে ২ বছর।

  ১০. ধর্ম, সরকারি ঋণ, সামরিক বিষয়, মুদ্রা, ডাক ও তার, দেশীয় রাজ্য প্রভৃতি বিষয় সম্পর্কিত আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে আইন পরিষদকে অবশ্যই গভর্নর জেনারেলের অনুমোদন নিতে হবে। গভর্নর জেনারেলের সম্মতি ব্যতীত কোনো বিলই আইনে পরিণত হবে না। তবে উল্লিখিত বিষয়গুলো ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে গভর্নর জেনারেলের পূর্বানুমতি না নিলেও চলবে।

১১. এ আইনে বলা হয় যে, আইনসভা বা আইন পরিষদ আইনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ না নিলেও চলবে। কর্তৃক প্রণীত আইনকে অবশ্যই ব্রিটিশ পার্লামেন্টের পাসকৃত

১২. মুম্বাই এবং মাদ্রাজ সরকারের আইন প্রণয়ন বিষয়ক ক্ষমতার পুনরুদ্ধার করা হয়। অর্থাৎ এ আইনে মাদ্রাজ ও মুম্বাই পরিষদের উপর আইন প্রণয়নের ক্ষমতা পুনরায় অর্পণ করা হয়।

ব্যবস্থাপক সভা গঠনের ব্যবস্থা করা হয়।

১৩. বাংলা, পশ্চিম প্রদেশে ও পাঞ্জাবে আইন পরিষদ বা

১৪. মাদ্রাজ ও মুম্বাইয়ের গভর্নর্দের কাউন্সিল বা পরিষদ ও এ আইনের দ্বারা সম্প্রসারিত হয়। এক্ষেত্রেও কিছু মর্যাদাসম্প ভারতীয়কে বেসরকারি সদস্যপদ গ্রহণ করার ব্যবস্থা করা হয়।

১৫. এ আইনে প্রাদেশিক আইন পরিষদের গৃহীত প্রস্তাব বা বলে উল্লেখ করা হয় । বিলসমূহ গভর্নরের অনুমোদন সাপেক্ষে আইনে পরিণত হবে।

১৬. সকল প্রাদেশিক আইনগুলো সংশোধন, মূলতুবি, ভেটো বা রদ করার ক্ষমতাও গভর্নর জেনারেলের উপর অর্পণ করা হয়।

১৭. এ আইনের দ্বারা ভারত সরকারের শাসন কার্যের সুবিধার জন্য ‘ পোর্ট ফোলিও’ (Port folio) ‘দপ্তর বণ্টন রীতি প্রবর্তন করা হয়। এক্ষেত্রে গভর্নর জেনারেল কর্তৃক শাসন পরিষদের সদস্যদের মধ্যে বণ্টিত বিশেষ কিছু বিষয় নির্বাহের ক্ষেত্রে সদস্যরা গভর্নর জেনারেলের নির্দেশ অনুসরণ করবে বলে স্থির করা হয়।

১৮. গভর্নর জেনারেলের শাসন পরিষদের সম্প্রসারিত সদস্যদের সম্পর্কে নতুন নীতি গৃহীত হয়। এক্ষেত্রে পঞ্চম সদস্যকে অবশ্যই বিশেষভাবে আইন বিষয়ে অভিজ্ঞ এবং সমাজব্যবস্থা সম্পর্কের বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গির অধিকার হবে বলে উল্লেখ করা হয়। অধিকন্তু অন্যান্য ৪ জন সদস্যের মধ্যে অন্তত ৩ জনকে ভারতবর্ষে ১০ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতাসম্পন্ন হতে হবে বলা হয় ।

আইনের তাৎপর্য/গুরুত্ব  ভারতীয় শাসনতান্ত্রিক বিকাশের ইতিহাসে ১৮৬১ সালের : ভারতীয় শাসনতান্ত্রিক বিকাশের ইতিহাসে ১৮৬১ সালের আইন অনেক পরিবর্তন আনে। ১৮৬১ সালের আইনের মাধ্যমে লর্ড ক্যানিং সরকারের কাজ কর্ম বিভিন্ন দফতরে বিভক্ত করে কাউন্সিলের এক একজন সদস্যর উপর একটি ভার অর্পণ করে ভারতীয় শাসনব্যবস্থার কেবিনেট প্রথা চালু করে। কাউন্সিলে কিছু সংখ্যক ভারতীয়কে গ্রহণ করে এবং প্রাদেশিক সরকারগুলোকে ক্ষমতা প্রত্যর্পণ করে এ আইন ভারতীয়করণ ও বিকেন্দ্রীয়করণের পথ প্রশস্ত করে এবং স্বায়ত্তশাসনের ভিত্তি রচনা করে। এছাড়া এ আইনে দপ্তর বণ্টন ন | রীতি প্রবর্তিত হওয়ায় ভারতীয় শাসনব্যবস্থায় কেবিনেট প্রথার প্রচলন শুরু হয়। ১৮৬১ সালের আইনের মাধ্যমে কিছুসংখ্যক = ভারতীয়কে গ্রহণ করার মধ্য দিয়ে পরবর্তীতে ভারতীয়দের নির্বাচিত প্রতিনিধিত্বের তীব্রতর হয়ে উঠে এবং ভারতীয়া রাজনৈতিকভাবে সচেতন হয়ে উঠতে থাকে । যার কারণে এ আইন = | প্রকৃত পক্ষে বেশ গুরুত্ব বহন করে। ১৮৬১ সালের আইনের মাধ্যমে গভর্নর জেনারেলের পরিষদকে আরো বেশি সম্প্রসারণ করা হয়। তাছাড়া ১৮৬১ সালের আইনে গভর্নর জেনারেলের শাসন বিভাগীয় কার্যাবলি পরিচালনার ভার সম্পূর্ণরূপে গভর্নর জেনারেলের শাসন পরিষদের উপর ন্যস্ত করা হয়।

গভর্নর জেনারেলের সম্প্রসারিত পরিষদের অর্ধেক সদস্য বেসরকারি স্তর থেকে গভর্নর জেনারেল কর্তৃক মনোনীত হবে এবং এক্ষেত্রে কিছু মর্যাদাসম্পন্ন ভারতীয়কে গভর্নর জেনারেল কর্তৃক গ্রহণের ব্যবস্থা করা হয়। অন্যদিকে লক্ষ্য করা যায় এ আইনে মাত্র কয়েকজন ভারতীয়কে গভর্নর জেনারেল কর্তৃক আইন পরিষদে মনোনীত করায় ভারতীয়দের নির্বাচিত প্রতিনিধিত্বের দাবিমূলত অপূর্ণ থেকে যায়। কেননা এখানে সরকারি সদস্যদের সংখ্যাধিক রেখে বেসরকারি সদস্যদের মতামতকে জলাঞ্জলি দেয়া হয় । এছাড়া বেসরকারি সদস্যদের অধিকাংশ সরকারের মনোনীত হওয়ায় তাদের পক্ষে সরকার বিরোধী কোনো মতপ্রকাশ করা সম্ভব হয়নি।

তাছাড়া কোনো আইন চূড়ান্ত করার অধিকার আইন পরিষদকে দেয়া হয়নি, বরং সকল আইন গভর্নর জেনালের সম্মতি সাপেক্ষে পাস করার রীতি গৃহীত হয়। যার কারণে বলা হয়ে থাকে এ আইন ছিল যথেষ্ট ত্রুটিপূর্ণ। তাছাড়া এ আইন ভারতীয়দের আশা- আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে সক্ষম হয়নি। কেননা এ আইনের মাধ্যমে প্রতিনিধিত্বের পরিধি বৃদ্ধি করার কোনো চেষ্টাও করা হয়নি।

উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, ১৮৬১ সালের ভারতীয় কাউন্সিল আইন ছিল একদিকে ভারতীয়দের জোরালো দাবিদাওয়া এবং অন্যদিকে ব্রিটিশ সরকারের সতর্কতামূলক সচেতনতার মধ্যে এক সাংবিধানিক সমন্বয়। এ আইনের কিছু দোষত্রুটি থাকলেও এ আইনের মাধ্যমে ভারতীয় কেন্দ্রীয় আইন পরিষদের কিছুসংখ্যক সদস্যের অংশগ্রহণের ব্যবস্থা করায় ভারতীয় শিক্ষিত শ্রেণির উত্তরোত্তর রাজনৈতিক আশা-আকাঙ্ক্ষা বৃদ্ধি করার একটি সুযোগ হয়।