― Advertisement ―

spot_img

১৮৯২ সালে কাউন্সিল আইনের ধারাসমূহ উল্লেখ কর।

ভূমিকা : ১৮৯২ সালের ভারতীয় কাউন্সিল আইনের দ্বারা জাতীয়দের দাবিদাওয়ার একটা বিশেষ দিক বাস্তবায়নের অগ্রগতি সাধন হয়। ভারতীয় উপমহাদেশের শাসনতান্ত্রিক ক্রমবিকাশের ধারায় ১৮৯২ সালের...
Homeঔপনিবেশিক শাসক১৮৩৩ সালের সনদ আইনের ধারা গুরুত্ব আলোচনা কর।

১৮৩৩ সালের সনদ আইনের ধারা গুরুত্ব আলোচনা কর।

ভূমিকা : ইংরেজি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৭৬৫ সালে বাংলা বিহার ও উড়িষ্যায় দেওয়ারি লাভ করে। এতে করে কোম্পানির কর্মকর্তা কর্মচারীদের অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্ত হয়। তারা ব্যাপকহারে দুর্নীতি ও কুশাসন শুরু করে দেয়। যার জন্য ১৭৭২ সালে কোম্পানি নিজ হাতে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানি ক্ষমতা হাতে নেয়। তবুও কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের দুর্নীতি ও কুশাসন করেনি। তাই ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ সালে রেগুলেটিং আইন পাস করে।

১৮৩৩ সালের সনদ আইনের ধারাসমূহ : ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির গঠনতন্ত্র ও ভারতীয় শাসনতন্ত্রের পরিবর্তন করার জন্য ১৮৩৩ সালের সনদ আইন পাস করে ব্রিটিশ সরকার। নিম্নে ১৮৩৩ সালের সনদ আইনের ধারাসমূহ আলোচনা করা হলো :

১. কোম্পানির মর্যাদা বৃদ্ধি : ১৮৩৩ সালের সনদ আইনে কোম্পানির মর্যাদা বৃদ্ধি করা হয়। এ আইনের মাধ্যমে ইংল্যান্ডের রাজা বা উত্তরাধিকারীদের পক্ষ হতে কোম্পানি ১৮৫৪ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ভারতীয় সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভ করে। প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা পেয়ে কোম্পানির শক্তি আরো বহুগুণে বেড়ে যায়।

২. চীন সাম্রাজ্যে একচেটিয়া বাণিজ্য অধিকার খর্ব : এই আইনের ধারায় বলা হয় যে, ১৮৩৩ সালের পর কোম্পানি আর কোনো বাণিজ্যিক অধিকার থাকবে না, তারা শুধু রাজনৈতিক কার্যক্রম করতে পারবে। এর পূর্বের চীন সাম্রাজ্যে কোম্পানি একচেটিয়া বাণিজ্য বিলুপ্ত করা হয় এবং অতিদ্রুত কোম্পানির বাণিজ্যিক কাজকর্ম না করতে বলা হয়।

৩. ভারতীয় আইনের বিধিবদ্ধকরণ : ১৮৩৩ সালে সনদ আইনে ভারতীয় আইনকে বিধিবদ্ধ করা হয়। পূর্বের আইনগুলো পূর্ণাঙ্গ ছিল না। তখন ভারতে নানান আইন চালু ছিল। কোনো মামলায় নির্দিষ্ট আইন ছিল না। অনেক আইনের মধ্যেও নানা ঝামেলা ছিল। তাই এই আইনে ভারতে প্রচলিত বিভিন্ন আইন সংগ্রহ করে একটি কমিশন গঠন করা হয় ।

৪. গভর্নর জেনারেল ও পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা : এই আইনে গভর্নর জেনারেল ও পরিষদের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করা হয়। পূর্বের তাদের কর্তৃক প্রণীত আইন কোম্পানি কর্মকর্তা ও ভারতের জনগণের জন্য প্রযোজ্য ছিল। তাদের আইন অপরাপর ইংরেজ ও বিদেশিদের উপর কার্যকর ছিল না। কিন্তু ১৮৩৩ সালের সনদ আইনে গভর্নর জেনারেল ও পরিষদের আইন প্রণয়নের ক্ষমতা দেওয়া হয় ।

৫. গভর্নর ও পরিষদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা : ১৮৩৩ সালের সনদ আইনে গভর্নর ও জন পরিষদ সদস্য দ্বারা প্রেসিডেন্সির সরকারগুলো শাসিত হবে। বাংলার গভর্নর হিসেবে কিছু সময় দায়িত্ব পালন করবে ভারতের গভর্নর। গভর্নর জেনারেলের নিয়ন্ত্রণাধীন করা হয় বোম্বাই ও মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির গভর্নরদ্বয়কে। গভর্নর জেনারেল এর এতে করে দায়িত্ব বেড়ে যায় ৷

৬. ভারতীয় রাজস্ব ঋণ শোধ : কোম্পানির কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কুশাসনে কোম্পানির অনেক ঋণ হয়ে যায় । ১৮৩৩ সালের সনদ আইনে বলা হয়েছে, কোম্পানির আগের সব ধরনের ঋণ ও পাওনা পরিশোধ করতে হবে । যা কোম্পানি শোধ করবে ভারতের রাজস্ব থেকে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে ।

৭. একজন আইন সদস্য নিযুক্ত : গভর্নর জেনারেলের জন্য একজন Law member নিযুক্ত করা হয় ১৮৩৩ সালের সনদ আইনের মধ্যে। কোম্পানির ডাইরেক্টর সভা কর্তৃক একজন আইন সদস্য নিযুক্ত হবে রাজার অনুমতিতে। তার কোনো ভোটাধিকার থাকবে না. গভর্নর জেনারেলের পরিষদে। তিনি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কাজে অংশ নিতে পারবে। যেহেতু তিনি আইন প্রণয়ন করবে।

৮. চাকরি ক্ষেত্রে বৈষম্যের অবসান : জাতি, ধর্ম, বর্ণ | নির্বিচারে ভারতীয় ও ব্রিটিশ নাগরিকদের চাকরিতে নিয়োগ করার নীতি গ্রহণ করা হয় ১৮৩৩ সালের সনদ আইনে। পূর্বে ভারতে চাকরি ক্ষেত্রে চরম বৈষম্য করা হয়। ভারতীয়দের যোগ্যতা থাকার পরেও তারা উচ্চপদের চাকরি করতে পারতো না। তাই এই আইনের ধারায় বলা হয় যে, চাকরির ক্ষেত্রে যোগ্যতা ছাড়া অন্যকিছু বিবেচনা করা হবে না ।

→ ১৮৩৩ সালের সনদ আইনের গুরুত্ব : নিম্নে ১৮৩৩ সালের সনদ আইনের গুরুত্ব আলোচনা করা হলো :

১. ব্রিটেন সরকারের কেন্দ্রীয় শাসন প্রতিষ্ঠা : ১৮৩৩ সালের সনদ আইনের মাধ্যমে ব্রিটিশ সরকার ব্রিটিশ ভারতের সমগ্র এলাকা নিয়ে সেখানে কেন্দ্রীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করে এবং ভারত সরকার হিসেবে নিয়োগ দেন বোর্ড অব কন্ট্রোল এর প্রেসিডেন্টকে । অর্থাৎ ভারত সরকারের মাধ্যমে ব্রিটিশ ভারতের নিয়ন্ত্রণ  ́ ছিল এবং কোম্পানির হাতে ছিল প্রশাসনিক দায়িত্ব। এ সনদের মাধ্যমে ব্রিটিশ সরকার ভারতে ব্রিটিশ শাসনের পথকে সুগম করে ।

২. ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ক্ষমতা হ্রাস : ১৮৩৩ সালের সনদ আইনের মাধ্যমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্যিক অধিকার বিলোপ করা হয় এবং কোম্পানিকে প্রশাসনের দায়িত্ব দেওয়া হয় । তবে ব্রিটিশ সরকার বাণিজ্যিক অধিকারের বিনিময়ে রাজস্ব প্রদানের ক্ষেত্রে চল্লিশ বছরের জন্য ১০% হারে ডিভিডেন্ট দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। এতে ভারতে কোম্পানির ক্ষমতা অনেকাংশে হ্রাস পায় এবং ব্রিটিশ সরকারের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।

৩. ব্রিটিশ ভারতকে একত্রীকরণ : ১৮৩৩ সালের সনদের মাধ্যমে বেঙ্গল, মাদ্রাজ ও বোম্বে প্রেসিডেন্সিকে একত্রিত করা জেনারেলকে ভারতবর্ষের গভর্নর হয়। বাংলার গভর্নর জেনারেলের দায়িত্ব প্রদান করে প্রেসিডেন্সিসমূহ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা প্রদান করা । তিনিই রাজস্ব আদায়, কোম্পানির আয়-ব্যয় হিসাব ও অর্থ বরাদ্দের দায়িত্ব দেওয়া হয়। পদ সৃষ্টি ও কোনো প্রেসিডেন্সির কর্মচারী অবাধ্য হলে তাকে বরখাস্ত করার দায়িত্ব পায় গভর্নর জেনারেল। এর মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ ভারতের সকল একত্রিত হয় এবং তা ব্রিটিশ সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।

৪. আইনব্যবস্থায় সংস্কার সাধন : ১৮৩৩ সালের সনদের পূর্বে প্রেসিডেন্সিগুলো তাদের নিজস্ব আইন নিজেরাই তৈরি করতো। এক প্রেসিডেন্সির আইন অন্য প্রেসিডেন্সিতে কার্যকর ছিল না। যার ফলে আইনগত বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। আইনি জটিলতা নিরসনে ব্রিটিশ সরকার সফল প্রেসিডেন্সি একত্রিত করে একই  আইন প্রয়োগের ব্যবস্থা করে এবং আইন প্রণয়নে সংশোধনের দায়িত্ব দেওয়া হয় গভর্নর জেনারেলকে দেওয়া হয়নি। এ সনদের বি মাধ্যমে আইন প্রণয়ন ব্যবস্থাকে কেন্দ্রিভূত করা হয় এবং আইন প্রণয়ন করার জন্য আইন কমিশন গঠন করা হয়। যার ফলে  ব্রিটিশ ভারত একই আইনের আওতায় আসে।

৫. সরকারি চাকরির পরিধি বৃদ্ধি : পূর্বে ব্রিটিশ ভারতে আ সরকারি চাকরির উচ্চ পদগুলোতে ইংরেজ এবং সর্বনিম্ন | পদগুলোর মধ্যে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভারতীয়দের নিয়োগ দেওয়া হতো। ১৮৩৩ সালের আইনের মাধ্যমে মেধা, যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে যেকোনো জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র ও ভাষার সরকারি চাকরি লাভের অধিকার পায়। সনদ আইনের মানুষ ৮৭নং ধারার মাধ্যমে এ বিধান পাস হয়। যার মাধ্যমে ভারতীয়রা সরকারি চাকরি লাভের সুযোগ পায়।

৬. কোম্পানির আদর্শে পরিবর্তন : ১৮৩৩ সালের সনদ আইনের মাধ্যমে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হয় এবং বাণিজ্যিক ক্ষমতার বিলোপ করা হয়। যার ফলে যে লক্ষ্য ও আদর্শ নিয়ে কোম্পানি ভারতে আসে তার পরিবর্তন ঘটে।

উপসংহার : সার্বিক আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায় যে, ১৮৩৩ সালের সনদ আইন কোম্পানির কার্যক্রমে ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে আসে। এর মাধ্যমে ব্রিটিশ সরকার ব্রিটিশ ভারতকে একত্রিত করে একই শাসন ও আইনের আওতায় নিয়ে আসে। পাশাপাশি ভারতীয়দের চাকরি সুযোগ প্রদান ও দাসত্বপ্রথা বিলোপ করা হয়। এ সনদের পর কোম্পানি জনগণের কল্যাণে ভূমিকা পালন করে। কারণ কোম্পানির বাণিজ্যিক অধিকার এ সনদের মাধ্যমে বিলুপ্ত করা হয় । যার মাধ্যমে ব্রিটিশ | ভারতে ব্রিটিশ সরকারে একাধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়।