― Advertisement ―

spot_img

১৯৪৭ সালে ভারত কেন বিভক্ত হয়েছিল? এই বিভক্তি কি অপরিহার্য ছিল?

অথবা, ১৯৪৭ সালের ভারত বিভক্তির প্রেক্ষাপট আলোচনা কর। ভূমিকা : পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো শাসনই চিরস্থায়ী নয়। যার শুরু আছে তার শেষও আছে। তবে কারো কারো...
Homeদক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠায় প্রেক্ষাপট আলোচনা কর । ১৯০৭ সালে কংগ্রেসে ভাঙ্গন...

ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠায় প্রেক্ষাপট আলোচনা কর । ১৯০৭ সালে কংগ্রেসে ভাঙ্গন ঘটে কেন?

ভূমিকা : ঊনিবিংশ শতাব্দীতে জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা এক যুগান্তকারী ঘটনা, ব্রিটিশ শাসনের প্রাথমিক পর্যায় থেকেই ভারতীয়রা তাদের বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলন করে, ব্রিটিশ সরকার ও ভারতীয়দের দমন করার লক্ষ্যে একের পর এক পদক্ষেপ ও বিভিন্ন আইন পাস করতে থাকে। এতে দেখা যায় ভারতীয়দের আশার তেমন কোনো প্রতিফলন ঘটেনি। ফলে ভারতীয় নেতারা নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করা ছাড়া আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হবে না বলে মতামত ব্যক্ত করেন। একপর্যায়ে অবসর প্রাপ্ত সিভিলিয়ান অ্যালন অক্টাভিয়ান হিউম ও লর্ড ডাফরিনের যৌথ প্রচেষ্টায় সর্বভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা লাভ করে।

→ কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার পটভূমি : ১৮৮৫ সালে কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা হলেও অনেক আগ থেকে তা প্রতিষ্ঠা করার জন্য সমাজের সকল সচেতন মহলে আলোচনা হয়। নিম্নে যে অবস্থার প্রেক্ষাপটে কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হয় তা আলোচনা করা হলো ::

১. শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রেরণ : যদিও কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৮৫ সালে, কিন্তু একটি সর্বভারতীয় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গঠনের তোড়জোড় শুরু হয় অনেক আগ থেকেই। ঊনবিংশ শতকের সত্তর দশক থেকেই ভারতীয়রা তাদের একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতে থাকে। এ সময় ভারতে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত এক শ্রেণির মধ্যবিত্তের উত্থান হয়। এ মধ্যবিত্ত শ্রেণি রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করে। তারা ভারতে প্রতিনিধিত্ত্বমূলক সরকার বা স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার পক্ষে মত প্রকাশ করেন। কিন্তু এ ধরনের ব্যবস্থাকে কার্যকরী করার জন্য যে একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের দরকার তা ভারতে ছিল না, তাই মধ্যবিত্ত শ্রেণির রাজনৈতিক সচেতনতা থেকে ইন্ডিয়া লীগ নামে একটি রাজনৈতিক সংস্থা গঠিত হয়। তবে এ সংস্থা পুরোপুরি সফল হতে পারেনি।

২. I.C.S পরীক্ষার নিয়ম পরিবর্তনের জন্য আন্দোলন : কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার শুরুর দিকে রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ভারতীয়দের স্বার্থরক্ষা এবং ভারতীয় জাতীয়তাবাদের বিকাশ সাধনে ‘ভারত সভা’ নামে একটি সংস্থা গঠন সুরেন্দ্রনাথের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে না ভারতসভা ভারতীয় IC.S পরীক্ষা সম্পর্কে ব্রিটিশ সরকারের নীতির ল ঘোরতর বিরোধিতা করে। এতে ব্রিটিশ সরকারের নির্ধারিত । বয়ঃসীমা ২১ থেকে কমিয়ে ১৯ বছর করার যে চক্রান্ত তার কঠোর শ সমালোচনা ভারত সভার মাধ্যমে করা হয়। এ আন্দোলনের চাপে ব্রিটিশ সরকার তার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয় ।

3. Vernacular press Act ও Arms Act পাসের প্রতিবাদ : ব্রিটিশ সরকারের প্রতিক্রিয়াশীল নীতির জন্য জাতীয় আন্দোলন র দ্রুতগতিতে অগ্রসর হয়। এছাড়া গণ অসন্তোষও দেখা দেয়। কারণ র ১৮৭৮ সালে লর্ড লিটন দেশীয় ভাষায় প্রকাশিত সংবাদপত্রকে

নিয়ন্ত্রণ করার জন্য Vernacular press Act ও Arms Act পাস করেন, যা শিক্ষিত ভারতীয়রা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেনি। এছাড়া ব্রিটিশ সরকার Arm Act পাস করেন, যার কোনো দরকার সে মুহূর্তে ছিল না, তাই এ সকল আইন পাস করার ফলে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় উঠে, আর প্রতিবাদের মাধ্যমেও তখন শিক্ষিত ভারতীয়রা বুঝতে পারে।

৪. ব্রিটিশ ও ভারতীয়দের মধ্যে বৈষম্যের অবসান : ১৮৮৫ সালে কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার সমকালীন সময়ে ব্রিটিশ সরকারের নীতির কারণে জাতিগত বৈষম্য চরম আকার ধারণ করে এ বৈষম্যমূলক নীতির কারণে ইংরেজ ও ভারতীয়দের সম্পর্কের অবনতি হয়। ১৮৮৩ সালে হলবার্ক বিলকে কেন্দ্র করে ব্রিটিশ সরকারের আচরণ ভারতীয়দের নিকট পরিষ্কার হয়। এ বিলের মাধ্যমে ভারতবাসীর যে আন্দোলন তা ছিল বিচারের ক্ষেত্রে যে বৈষম্য তার অবসান করার। এক পর্যায়ে লর্ড ইলবার্টের নেতৃত্বে একটি আইন প্রণয়ন করা হলেও ইউরোপীয় নেতাদের চাপে তা আবার সংশোধন করা হয়। তাই এ কার্যকলাপের ফলে ব্রিটিশ সরকারের প্রতি ভারতীয়রা তাদের আস্থা হারিয়ে ফেলে এসব ঘটনাবলির মাধ্যমে তারা একটি স্থায়ী সিদ্ধান্তে এ উপনীতি হন যে, স্থায়ী কোনো সংগঠন ছাড়া ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে সফল হওয়া যাবে না। ফলে তারা একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠার জন্য জোর তৎপরতা চালান ।

৫. প্রথম জাতীয় সম্মেলনের আহ্বান/ সিদ্ধান্ত : কলকতায় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ১৮৮৩ সালে এক আর্ন্তজাতিক প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয় । ভারতের বিভিন্ন স্থান থেকে বহু বিশিষ্ট নেতা এ সময় কূটকৌশলের আশ্রয় নিয়ে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় কলকতায় এক জাতীয় সম্মেলন আহ্বান করেন। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শতাধিক প্রতিনিধি এ সম্মেলনে যোগ দেয়, এ সভায়শিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষা, বৃহত্তর কার্যসংস্থান বিচার ব্যবস্থার পৃথকীকরণ ও প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার গঠন বিষয়ে আলোচনা হয়। এ সম্মেলনের সফলতা ছিল অনেক যার ফলে কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার অগ্রগতি আরো এক ধাপ এগিয়ে যায়।

৬. দ্বিতীয় জাতীয় সম্মেলনের সিদ্ধান্ত : ১৮৮৩ সালের প্রথম জাতীয় সম্মেলন সফল হলে ১৮৮৫ সালের ডিসেম্বর মাসে দ্বিতীয় জাতীয় সম্মেলনের আহ্বান করা হয় কলকতায়। এ সভার আলোচ্য বিষয় ছিল সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার সংস্কার একযোগেইংল্যান্ড ও ভারতে পরীক্ষা গ্রহণ, অস্ত্রআইন রহিতকারণ, বিচার ও শাসন বিভাগের পৃথকীকরণ, সামরিক ও সাধারণ প্রশাসন বিভাগের ব্যয়ভার কমানো হয়। এসব বিষয়ে আলোচনার অন্ত রালে কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার জন্য ভারতীয় নেতারা চেষ্টা চালান। ফলশ্রুতিতে এ সম্মেলনে কংগ্রেস গঠন করার পূর্ণ মনোভাব নিয়ে ১৮৮৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর দ্বিতীয় অধিবেশন সমাপ্ত হয় ।

৭. অক্টাভিয়ান হিউমের অবদান : জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠায় সবচেয়ে বড় অবদান রাখেন অবসরপ্রাপ্ত ব্রিটিশ সিভিলিয়ান অ্যালন অক্টাভিয়ান হিউম। তিনি ভারতীয়দের স্বার্থে নিজেকে জড়িত করেন । তিনি ভারতীয়দের মনোভাব বুঝে তাদের অসন্তোষ প্রশমিত করার জন্য চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে ১৮৮৩ সালের ১ মার্চ তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকবাদের উদ্দেশ্যে একটি খোলা চিঠিতে তাদের রাজনৈতিক, সামাজিক, মানসিক ও নৈতিক ’ উৎকর্ষ লাভের জন্য একটি স্থায়ী সংগঠন গঠনের উপদেশ দেন। এছাড়া লর্ড ডাফরিনও অনুকূল মনোভাব দেখান । ১৮৮৪ সালে হিউম ডাফরিনের সাথে সাক্ষাত করেন এবং তাঁর পরিকল্পনার কথা বললে ডাফরিন হিউমের কথার সমর্থন করেন। এক পর্যায়ে ১৮৮৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর মাসে মোম্বাই শহরে জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা হয়। ফলে ভারতের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয় ।

→ কংগ্রেসে ভাঙ্গন ঘটার কারণ : ১৮৮৫ সারে ইংরেজ সিভিলিয়ান অ্যালান অষ্টাভিয়ান হিউমের পৃষ্ঠপোষকতায় ভারতের মুম্বাই শহরে কংগ্রেস গঠিত হয়। প্রথম পর্যায়ে কংগ্রেসের উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশদের সঙ্গে সহযোগিতা করা এবং ভারতীয়দের কিছু দাবি-দাওয়া আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে আদায় করা। পরবর্তীতে কংগ্রেস সরকারের গঠনমূলক সমালোচনাও শুরু করে। তবে তা ছিল খুবই সীমিত ।

কিন্তু কংগ্রেসের এ অবস্থা বেশি দিন চলেনি। ব্যাপকভাবে শিক্ষিত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি কংগ্রেসে যোগ দিতে থাকে। ফলে এটি একটি সর্বভারতীয় সংগঠন পরিণত হয়। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে কংগ্রেসে নেতৃত্বের পরিবর্তন ঘটে। কংগ্রেস দুটি উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এক অংশ সরকারি কর্মকাণ্ড সমর্থন করার পক্ষপাতি এবং আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে দাবি দাওয়া আদায়ের কৌশলে বিশ্বাসী ছিল। এদেরকে বলা হত মডারো বা উদারপন্থি। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নেতা ছিলেন গোপালকৃষ্ণ গোখেলে, সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী, দাদা ভাই নওরোজী, ফিরোজ শাহ, মেহেততা, রাসবিহারী ঘোষ এবং বদরুদ্দিন তৈয়বজী প্রমুখ । এরা উগ্রপন্থি ছিলেন না, এরা ছিলেন সংস্কারবাদী।

কংগ্রেসের অপর অংশ ছিল বয়সে তরুণ। তারা বিবর্তন বা সংস্কারে বিশ্বাসী ছিলেন না। তারা স্বশাসনে বিশ্বাসী ছিলেন। তাদের নীতি ছিল আন্দোলন সংগ্রাম করা। তারা বয়কটেও বিশ্বাসী । ছিলেন। ফলে বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে কংগ্রেসের মধ্যে বিভক্তি সুস্পষ্ট হযে ওঠে। কংগ্রেসের এ পর্যায়ে যারা নেতা ছিরেন তারা হলেন বালগঙ্গধর তিলক, লালালাজপত রায়, এ্যানি বেসান্ত, বিপিনচন্দ্র পার, অরবিন্দ ঘোষ প্রমূখ। এরা ছিলেন উগ্রপন্থি। এরা কঠোর হিন্দুত্ববাদীও ছিলেন। এ কারণে অনেক মুসলিম নেতা । কংগ্রেসে যোগ দেননি। এই সংস্কারবাদী ও উগ্রবাদী দুই দলের বিরোধের কারণে ১৯০৭ সালে সুরাট অধিবেশনে কংগ্রেস দুইভাগে বিভক্ত হয় বা কংগ্রেসের ভাঙ্গন ঘটে।

উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, ১৮৮৫ সালে যে সর্বভারতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা হয় তা যদি ও ভারতবাসীর রাজনৈতিক সচেতনতার ফসল ছিল না। তথাপিও ভারতবর্ষের শাসনকেন্দ্রিক সমস্যা সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ দেখা যায় . যে, ভারতের শিক্ষিত জনসাধারণ কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করার পূর্বে যে রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলেন তা ছিল সীমাবদ্ধ পরিসরে, এগুলো তেমন ব্যাপকতা লাভ করতে পারেনি। অতএব বলা যায়, সর্বভারতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই শিক্ষিত ভারতবাসী 1 আশার আলো দেখতে পান ।