― Advertisement ―

spot_img

১৯৪৭ সালে ভারত কেন বিভক্ত হয়েছিল? এই বিভক্তি কি অপরিহার্য ছিল?

অথবা, ১৯৪৭ সালের ভারত বিভক্তির প্রেক্ষাপট আলোচনা কর। ভূমিকা : পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো শাসনই চিরস্থায়ী নয়। যার শুরু আছে তার শেষও আছে। তবে কারো কারো...
Homeদক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসখিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলন সম্পর্কে একটি প্রবন্ধ লিখ।

খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলন সম্পর্কে একটি প্রবন্ধ লিখ।

অথবা, খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলন সম্পবে একটি প্রবন্ধ লিখ।

ভূমিকা : ভারতবর্ষের মুসলমানরা তুরস্কের খিলাফতকে রক্ষা করার জন্য ব্রিটিশ বিরোধী এক বিরাট আন্দোলন গড়ে। পরবর্তীতে ১৯১৯ সালে মুসলমানদের ব্রিটিশ বিরোধী অনেকগুলো প্রস্তাবের সাথে গান্ধীজী একাত্মতা ঘোষণা করে। অসহযোগ আন্দোলনের নেতাদের উদ্দেশ্য ছিল স্বরাজ লাভ এবং ব্রিটিশ সরকারের নিপীড়নমূলক আচরণের প্রতিবাদ জানানো। ফলে ১৯২০ সালে খিলাফত ও অসহযোগ নেতাদের ব্রিটিশ বিরোধী এ আন্দোলনের কর্মসূচি হিসেবে অনেকগুলো সিদ্ধান্ত প্রস্তাব করেন। খিলাফত ও অসহযোগ পরবর্তীতে ব্যর্থ হলে ও বলা যায় এই দুটি আন্দোলন মুসলমানদের ও হিন্দুদের মধ্যে চেতনার উন্মেষ ঘটায়। যা ব্রিটিশ শাসনের স্তম্ভ একটু হলেও দুর্বল করেছিল ।

→ খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনের একত্রীকরণ ও কর্মসূচি নির্ধারণ : মুসলমান ও হিন্দু নেতাগণ বুঝতে পেরেছিল ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন বেগবান করতে হলে হিন্দু ও মুসলমান যৌথ উদ্যোগের এ আন্দোলন পরিচালনা করতে হবে। এ লক্ষ্যে ১৯১৯ সালের শেষ সপ্তাহে মুসলিম লীগ ও কংগ্রেস অমৃতসরে তাদের বার্ষিক অধিবেশনে মিলিত হন। ১৯২০ সালে ১৯ জানুয়ারি ড. আনসারীর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল ভাইসরয় লর্ড চেমসফোর্ডের সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং প্রতিনিধিদল ভাইসরয়ের কাছে তুরস্কের সাম্রাজ্যে ও খলিফা হিসেবে মুলতানের সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন । মুহাম্মদ আলীর নেতৃত্বে একটি দল লয়েড জর্জের সাথে সাক্ষাৎ করেন। কিন্তু তারা সকল ক্ষেত্রে ব্যর্থ হন। মওলানা মুহাম্মদ আলী খিলাফতকে রক্ষা করার জন্য বক্তৃতা প্রদানকালে বলেন, মুসলমানরা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে কিন্তু আস্থা বিক্রয় করবে না। মওলানা মুহাম্মদ আলী, মওলানা শওকত আলী ভারতের বিভিন্ন স্থান সফর করেন। ১৯২০ সালের ২৮ মে বোম্বোতে খিলাফত কমিটির এক সভায় অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচি নেওয়া হয়। হিন্দু ও মুসলমানরা জুন মাসের দিকে এক যৌথ সভার ডাক দেয় এবং কমিটিতে ভবিষ্যৎ আন্দোলনের কর্মসূচি ডাক দেয়া হয়। আর দুই দলের মধ্যে ১৯২০ সালের ১০ আগস্টে স্যাভার্স-এর চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

গান্ধীজী কলকাতা ও নাগপুরে অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন।

১. খেতাব ও পদবি বর্জন।

২. বিদেশি পণ্য বর্জন ও স্বদেশী পণ্য ব্যবহার ।

৩. স্কুল, কলেজ, আদালত সরকারি পরিষদ ও সরকারি বর্জন ইত্যাদি

এছাড়া আরও কিছু কর্মসূচির কথা উল্লেখ করা হয়-

১. চরকায় সুতা কাটার উৎসাহ দান ।

২. সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং অস্পৃশ্যতা দূরীকরণ ইত্যাদি ।

৩. ব্রিটিশ আদালতের পরিবর্তে পঞ্চায়েত গড়ে তোলা ।

অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেই খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলন ক্রমে দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করে। গান্ধীজীর ডাকে ছাত্রগণ স্কুল কলেজ ছেড়ে এসে ধর্মঘটের ডাক দেন। আইনজীবীগণ আদালত ত্যাগ করেন, বিদেশি পণ্যসামগ্রী বর্জন ও পুড়িয়ে ফেলা হয় এবং সব জায়গায় দেশীয় পণ্য ব্যবহারের প্রসার ঘটে। চিত্তরঞ্জন দাস, রাজেন্দ্র প্রাসাদ, মতিলাল নেহেরু, রাজা গোপাল বারী প্রমুখ আইনজীবীগণ তাদের আইন ব্যবসা পরিত্যাগ করে আন্দোলনে যোগ দেন। ১৯২১ সালে D কাশী বিদ্যাপীঠ, বারানসী বিদ্যাপীঠ, বঙ্গীয় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হলে সর্বকালে এক নতুন উৎসাহ উদ্দীপনা দেখা যায় আন্দোলনের ক্ষেত্র, যা আন্দোলনের গতি বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রগণ ও জামিয়া মিল্লিয়া ইসলামিয়া নামে নতুন এক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে। ১৯২১ সালে প্রিন্স অব ওয়েলস বোম্বাই ও কলকাতায় ধর্মঘট পালিত হয়।

→ খিলাফত আন্দোলনের ফলাফল :

১. নাগরিক অধিকার বোধের ধারণার উৎপত্তি : ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ভারতবর্ষে যতগুলো আন্দোলন সংঘটিত হয়েছে তার বেশির ভাগ ছিল শিক্ষিত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির নেতৃত্বে, কিন্তু খিলাফত আন্দোলন ছিল ভারতের সর্বস্তরের জনগণের আন্দোলন । এ প্রসঙ্গে ডা. রমেশচন্দ্র মজুমদার বলেন, “The movement served as buptism of fire which initiated the people to a new faith and new hope and inspired with a new confidence in their power to fight for freedom. As a result the congrees movement for the first time became a really mass movement.” ফলে বলা যায় খিলাফত আন্দোলনে সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে অধিকারের দাবি জানানো হয়।

২. ব্রিটিশ শাসকশ্রেণির সচেতনতা : খিলাফত আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ভারতে ব্রিটিশ শাসকশ্রেণি অনেকটা উদ্বিগ্ন হয়ে নিজেদের অবস্থান মজবুতকরণে আরো মনযোগী হয় এবং রাজনৈতিক দিক থেকেও আরো সাংগঠনিক হয় ।

৩. মুসলিম নেতৃত্ব : খিলাফত আন্দোলনের মাধ্যমে ভারতবর্ষে মুসলমান নেতৃত্বর আবির্ভাব ঘটে। আর ভারতীয় জনগণও মুসলমান • নেতৃত্বের প্রতি আস্থা ফিরে পায় । যা ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে মুসলমানদের জন্য একটি ইতিবাচক বিষয় ছিল ।

৪. কংগ্রেসের শক্তি বৃদ্ধি : খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে ভারতে জাতীয় কংগ্রেসের শক্তি বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। কংগ্রেস নিজেদের প্রচার প্রবণতা মাধ্যমেও ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। আর কংগ্রেসের এটিই ছিল ব্রিটিশ বিরোধী প্রথম আন্দোলন ।

৫. রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ : এই আন্দোলনের মাধ্যমে প্রথম ভারতবাসী ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে নিরস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত হয়। খিলাফত আন্দোলনে দেশের সর্বস্তরের মানুষ প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করে। ছাত্র, চাকরিজীবী, আইনজীবী, বেকার, শ্রমিক, শিক্ষিত সবাই তাদের অধিকার আদায়ের জন্য আন্দোলনে অংশ গ্রহণ করে, ফলে ভারতবাসীর মধ্যে রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ ঘটে ।

৬. সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি স্থাপন : খিলাফত আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ভারত মুসলমান ও হিন্দুদের মধ্যে একটি সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ১৯১৬ সালে একপর্যায়ে ভারতে হিন্দু মুসলমান ঐকমত্যে পৌঁছায়, আবার ১৯২০ সালে খিলাফত আন্দোলনের সময়ও হিন্দু – মুসলমানের মধ্যে যথেষ্ট ঐকমত্য লক্ষ্য করা যায় এবং খিলাফত আন্দোলনের যৌথ উদ্যোগে বেশ বেগবান হয়েছিল।

উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, ১৯১৯ সালের আইনের প্রতিবাদে ভারতীদের যে অসহযোগ আন্দোলন এবং খিলাফত কমিটির নেতাদের নেতৃত্বে যে অসহযোগ আন্দোলন ছিল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কেননা এক পর্যায়ে দুটি আন্দোলন জাতীয় ঐকমত্যে এসে কর্মসূচি নির্ধারণ করেন যা ইতিহাসে তুলনাহীন। গুরুত্ব বিচারে এ আন্দোলন ঐতিহ্যবাহী ছিল। তবে সফল না হওয়ায় কেবল হতাহত হয় মাত্র ।