― Advertisement ―

spot_img

১৯৪৭ সালে ভারত কেন বিভক্ত হয়েছিল? এই বিভক্তি কি অপরিহার্য ছিল?

অথবা, ১৯৪৭ সালের ভারত বিভক্তির প্রেক্ষাপট আলোচনা কর। ভূমিকা : পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো শাসনই চিরস্থায়ী নয়। যার শুরু আছে তার শেষও আছে। তবে কারো কারো...
Homeদক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস১৯৪৭ সালের ভারত স্বাধীনতা আইনের বৈশিষ্ট্যসমূহ আলোচনা কর।

১৯৪৭ সালের ভারত স্বাধীনতা আইনের বৈশিষ্ট্যসমূহ আলোচনা কর।

অথবা, ১৯৪৭ সালের ভারত স্বাধীনতা আইনের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ পরীক্ষা কর।

অথবা, ১৯৪৭ সালের ভারতীয় স্বাধীনতা আইনের ধারাসমূহ পর্যালোচনা কর।

ভূমিকা : ব্রিটিশরা ১৭৫৭ সাল থেকে প্রায় ২০০ বছর ভারতবর্ষ শাসন করেন। কিন্তু শাসনের শেষ পর্যায়ে এসে ভারতবর্ষে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে দ্বন্দ্ব ব্রিটিশ শাসনের ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়। বিশেষ করে অন্তবর্তীকালীন সরকার নিয়ে দুই দলের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। তখন ব্রিটিশরা বুঝতে পারে ভারত ছেড়ে না গেলে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। লর্ড মাউন্ট ব্যাটেন ভারত বিভক্তির ঘোষণা দিলে কংগ্রেস এ পক্ষে ছিল না কিন্তু পরবর্তীতে হিন্দু- মুসলিম দাঙ্গা সংঘটিত হয়। তাতে কংগ্রেস ভারত বিভাগ প্রস্তাব মেনে নেয়। মুসলমানরা সবসময় ভারত বিভক্তি এবং নিজেদের জন্য স্বতন্ত্র ভূখণ্ড প্রতিষ্ঠার পক্ষে ছিল। অতঃপর ব্রিটিশ ভারতের সর্বশেষ ভাইসরয় লর্ড মাউন্ট ব্যাটেন, নেহেরু, জিন্নাহ ও শিখ নেতা বলদেব সিংহের সাথে এক বৈঠকে মিলিত হয় ৩ জুন ব্যাটেন এ পরিকল্পনা গ্রহণ করেন এবং ১৯৪৭ সালের ১৮ জুলাই ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ভারত স্বাধীনতা আইন পাস হয়। এ আইন পাসের মাধ্যমে ভারতবাসীর বহু প্রতিক্ষীত স্বাধীনতা ফিরে পায় এবং মুসলমানরা নিজেদের ভূখণ্ডে বসবাসের সুযোগ লাভ করে ।

→ ১৯৪৭ সালের ভারত স্বাধীনতা আইনের বৈশিষ্ট্য/ধারাসমূহ : ১৯৪৭ সালের ভারত শাসন আইনের ধারাসমূহ ছিল ভারতবাসীর জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ । নিম্নে ধারাগুলো বর্ণনা করা হলো :

১. পৃথক ডোমিনিয়ন স্থাপন : ১৯৪৭ সালের ভারত স্বাধীনতা আইনে ভারতবর্ষকে বিভক্ত করা ছিল অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা। এ আইন অনুযায়ী ভারতবাসীর বহু প্রতীক্ষিত স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেওয়া হয় এবং ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারতবর্ষকে ভেঙ্গে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি পৃথক ডোমিনিয়ন স্থাপন করা। হিন্দু-মুসলমান সংখ্যা গরিষ্ঠতার ভিত্তিতে এই ভাগ করা হয়। মুসলমান অধ্যুষিত অঞ্চল নিয়ে পাকিস্তান এবং হিন্দু অধ্যুষিত অঞ্চল নিয়ে ভারত গঠিত হয়।

২. গণপরিষদ গঠন : ১৯৪৭ সালের ভারত শাসন আইনে দুটি ডোমিনিয়ন এর জন্য দুটি গণপরিষদ গঠন করা হয়। গণপরিষদের হাতে নতুন শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করার ক্ষমতা প্রদান করা হয়। আরো বলা হয়, নতুন শাসনতন্ত্র প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত গণপরিষদ কেন্দ্রীয় আইন পরিষদ হিসেবে কাজ করে যাবে। গণপরিষদ দুই ধরনের কাজ করবে- ১। ভবিষ্যতের জন্য সংবিধান রচনা করা এবং কেন্দ্রীয় আইন সভার কাজ করবে।

৩. ব্রিটিশ সরকারের নিয়ন্ত্রণমুক্ত : ১৯৪৭ সালের ভারত শাসন আইনে বলা হয় যে, ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্টের পর ভারতবর্ষে ব্রিটিশ সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ বা কর্তৃত্ব থাকবে না। অর্থাৎ ভারত ও পাকিস্তান স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে পরিচালিত হবে। এখন থেকে ব্রিটিশ সরকার ভারতবর্ষের উপর সব ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে ব্রিটেনে গমন করবে।

৪. কমনওয়েলথ এর সদস্যভুক্ত হওয়া নিয়ে সিদ্ধান্ত : ১৯৪৭ সালের আইনে বলা হয় যে, নতুন সৃষ্ট দুটি দেশ ভারত ও পাকিস্তান কমনওয়েলথভুক্ত দেশ হিসেবে থাকবে কি-না সেই সিদ্ধান্ত ভারত ও পাকিস্তান নিজ নিজ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।

৫. গভর্নর জেনারেল নিয়োগ : এ আইনে আরো বলা হয়, প্রত্যেক ডোমিনিয়নের জন্য একজন গভর্নর জেনারেল নিয়োগ করা হবে। এই গভর্নর জেনারেল ডোমিনিয়নের শাসনের ক্ষেত্রে ব্রিটিশ শাসনের প্রতিনিধিত্ব করবেন এবং গভর্নর জেনারেল ডোমিনিয়ন মন্ত্রিসভার পরামর্শক্রমে ব্রিটিশ রাজা বা রানি কর্তৃক নিযুক্ত হবেন ।

৬. দেশীয় রাজ্যগুলোর উপর থেকে ব্রিটিশ কর্তৃত্বের অবসান : ১৯৪৭ সালের ভারত শাসন আইন পাস হওয়ার পূর্বে দেশীয় রাজ্যগুলোর উপর ব্রিটিশ সরকারের পুরোপুরি কর্তৃত্ব ছিল। কিন্তু বি এ আইন পাস হলে দেশীয় রাজ্যগুলোর উপর ব্রিটিশ সরকারের কর্তৃত্ব পুরোপুরি বিলীন হয় এবং আরোও বলা হয়, দেশীয় ম রাজ্যগুলো ইচ্ছামতো যে-কোনো ডোমিনিয়নে যোগদান করতে নি পারবে বা স্বাধীনভাবে থাকতে পারবে। অর্থাৎ এখন থেকে যে- কোনো সিদ্ধান্ত দেশীয় রাজ্যগুলো নেওয়ার ক্ষমতা রাখে।

৭. ভারত সচিব পদের অবসান : এই আইন হওয়ার পূর্বে ব ভারত সচিবের পদ বিদ্যমান ছিল। কিন্তু ১৯৪৭ সালের ভারত বি শাসন আইন পাস হওয়ার পর থেকে ভারত সচিব পদের অবসান ঘটানো হয় এবং শাসনকার্যের সুবিধার্থে ভারত সচিবের দায়িত্ব ক্ষু কমনওয়েলথ সচিবের উপর অর্পণ করা হয় ।

৮. গভর্নর জেনারেল ও গভর্নরের স্বৈরাচারী ক্ষমতার অবসান : ১৯৪৭ সালের আইনে জেনারেল ও গর্ভনরের স্বৈরাচারী ক্ষমতার বিলোপ সাধন করা হয়। এ আইনে আরো বলা হয়, গভর্নর 5 জেনারেল ও গভর্নর পূর্বের মতো ক্ষমতা বহন করে সবকিছু করতে • পারবে না বরং শাসনকার্য পরিচালনার ক্ষেত্রে ডোমিনিয়ন মন্ত্রিপরিষদের • উপর নির্ভর করবে। এ আইনের ফলে ভারতীয় ডোমিনিয়ন মন্ত্রিপরিষদ অনেক ক্ষমতার অধিকারী হয়।

৯. কর্মচারীদের বেতন ভাতা সংরক্ষণ ও নিয়মাবলি : ১৯৪৭ সালের আইন পাসের পূর্বে কর্মচারীদের বেতন পাস সংক্রান্ত কোনো নিয়মাবলি ছিল না। কিন্তু এ আইন পাসের মাধ্যমে ভারত সচিব কর্তৃক নিযুক্ত রাষ্ট্রীয় কর্মচারী এবং ফেডারেল কোর্ট ও হাইকোর্টের বিচারকদের বেতন, ছুটি পেনশনকাল প্রভৃতি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। যা এ আইনের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ছিল ।

১০. প্রাদেশিক মন্ত্রিপরিষদ সদস্য নিয়োগ : ১৯৪৭ সালের আইনে প্রাদেশিক শাসনকার্য পরিচালনার জন্য মন্ত্রিদের নিয়োগের ক্ষেত্রে জেনারেল এর কর্তৃত্ব বজায় থাকবে।

১১. ডোমিনিয়ন ছুটির শাসনব্যবস্থা : ১৯৪৭ সালের ভারত শাসন আইন অনুসারে বলা হয় যে, নতুন সংবিধান প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ডোমিনিয়ন ও তাদের অন্তর্গত প্রদেশগুলো ১৯৩৫ সালের যে ভারত শাসন আইন রয়েছে সে অনুযায়ী শাসিত হবে। আর প্রয়োজনবোধে প্রতিটি ডোমিনিয়ন ভারত শাসন আইন পরিমার্জিত বা সংশোধিত করার ক্ষমতা এই ডোমিনিয়ন রাখবে।

১২. সীমানা কমিশন গঠন : ১৯৪৭ সালের ভারত শাসন আইন অনুসারে বাংলা ও পাঞ্জাব বিভক্ত হয়ে ভারত বা পাকিস্তান যোগদান করবে কি না তা ভোটাভুটির মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে। আর ভোটাভুটির মাধ্যমে প্রদেশগুলো, বিভক্ত হলেও প্রদেশগুলোর সীমানা নির্ধারণের জন্য সীমানা কমিশন নামে একটি কমিশন গঠন করা হয়।

১৩. প্রদেশ সংযুক্তির সিদ্ধান্ত : ১৯৪৭ সালের ভারত শাসন আইন অনুসারে সিন্ধু প্রদেশ ভারত বা পাকিস্তানের যোগদান করবে কি না তা প্রদেশের আইনসভা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে এছাড়াও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ কোন দেশের সাথে যুক্ত হবে তা ঠিক করবে প্রদেশের আইনসভা। তবে বাংলাকে নিয়ে অনেক সমস্যা সৃষ্টি হলেও শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হয় যে, বাংলাকে বিভক্ত করা হলে আসামের সিলেট জেলা সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান প্রদেশের সাথে যুক্ত হবে কিনা তা নির্ধারিত হবে গণভোটের মাধ্যমে। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে প্রদেশগুলো নিয়ে ভারত-পাকিস্ত ান দ্বন্দ্বের কিছুটা অবসান ঘটে।

উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, ১৭৫৭ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ সরকার প্রায় দুইশ বছর ভারতবর্ষ শাসন করেন। ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীনতা আইন পাসের মাধ্যমে ব্রিটিশ অধ্যায়ের শেষ হয়। বিশ্বের বুকে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। ভারত বিভক্ত হওয়ায় হিন্দুরা কিছুটা ক্ষুব্ধ হলেও শেষ পর্যন্ত এ বিভাগকে স্বাগত জানায় এবং মুসলমানদের বহু দিনের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়।