― Advertisement ―

spot_img

১৮৯২ সালে কাউন্সিল আইনের ধারাসমূহ উল্লেখ কর।

ভূমিকা : ১৮৯২ সালের ভারতীয় কাউন্সিল আইনের দ্বারা জাতীয়দের দাবিদাওয়ার একটা বিশেষ দিক বাস্তবায়নের অগ্রগতি সাধন হয়। ভারতীয় উপমহাদেশের শাসনতান্ত্রিক ক্রমবিকাশের ধারায় ১৮৯২ সালের...
Homeঔপনিবেশিক শাসক১৯২৩ খ্রিস্টাব্দের বেঙ্গল প্যাক্টের শর্তাবলি লিখ। এর ব্যর্থতার কারণসমূহ লিখ ।

১৯২৩ খ্রিস্টাব্দের বেঙ্গল প্যাক্টের শর্তাবলি লিখ। এর ব্যর্থতার কারণসমূহ লিখ ।

ভূমিকা : ১৯২৩ সালের বেঙ্গল প্যাক্ট বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে হিন্দু, মুসলিম বিরোধ ছিল দীর্ঘদিনের। কিন্তু স্বাধিকার আন্দোলনের জন্য এ দুই সম্প্রদায়ের পারস্পরিক সম্পর্কের উন্নয়ন ছিল এক অপরিহার্য বাস্তবতা। গভীর আত্মোপলব্ধি থেকেই হিন্দু মুসলিম ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলার সময়ে ১৯১৬ সালের বেঙ্গল প্যাক্ট, ১৯২০ সালের খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলন গড়ে তোলে। বেঙ্গল প্যাক্ট ছিল হিন্দু মুসলমান দ্বন্দ্ব নিরাময়ের এক উদারনৈতিক পদক্ষেপ। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের একান্ত উদ্যোগ প্রচেষ্টায় ও বেঙ্গল প্যাক্ট নামক হিন্দু, মুসলিম, ঐক্যের ঐতিহাসিক চুক্তিটি রচিত হয়েছিল ।

— ১৯২৩ সালের বেঙ্গল প্যাক্টের পটভূমি : ব্রিটিশ ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনসমূহের মধ্যে ১৯২০-২১ সালের মহাত্মা গান্ধী এর নেতৃত্বে খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলন সর্বপ্রথম সমর্থন লাভে সক্ষম হয় এবং ব্রিটিশ আমলাতন্ত্রের শক্তি ও প্রশাসনিক যোগ্যতার বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু কতিপয় উগ্রপন্থী ১৯২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে চৌরিচিরিয়াতে পুলিশ ফাঁড়ি জ্বালিয়ে দিলে ২২ জন পুলিশ মারা যায়। ১৯১৯ সালের ভারত শাসন আইন অনুযায়ী প্রতিবছর অন্তর নির্বাচনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। ১৯২১ সালের পর ১৯২৩ সালে নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল, চিত্তরঞ্জন দাসের পরিকল্পনা অনুযায়ী ঠিক কংগ্রেসীরা নির্বাচন আমলাগুলো দখল করে সরকারী নীতির বিরোধিতা করবে। ১৯২২ সালের ৩১ ডিসেম্বর নির্বাচনে চিত্তরঞ্জন দাস ও সুভাস চন্দ্র বসু সভাপতি ও কর্মসচিব নির্বাচিত হন। স্বরাজ পার্টির পক্ষে সমর্থন গোছাতে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ১৯২৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর চিত্তরঞ্জন দাস তার মুসলিম সহযোগী বাংলার মৌলভী আব্দুল করিম, মাওলানা আকরাম খা, মনিরুজ্জামান ইসলামবাদী এবং মৌলভী মুজিবুর রহমানকে নিয়ে একটি চুক্তি সম্পাদন করেন যা ঐতিহাসিক বেঙ্গল প্যাক্টর নামে পরিচিত

→ ১৯২৩ সালের বেঙ্গল প্যাক্টের ধারাসমূহ : ১৯২৩ সালের বেঙ্গল প্যাক্ট বা বঙ্গীয় চুক্তির প্রধান প্রধান ধারা বা শর্তসমূহ নিচে উল্লেখ করা হলো :

১. আইনসভা গঠন : এ চুক্তিতে বলা হয় বঙ্গীয় আইনসভায় হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে প্রতিনিধি নির্বাচিত হবে জনসংখ্যার ভিত্তিতে। ২. প্রতিনিধি নির্বাচন : এ চুক্তির ধারা অনুযায়ী বঙ্গীয় আইনসভায় ১৯০৯ সালের আইন প্রবর্তিত পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে। অর্থাৎ আইনসভার প্রতিনিধিত্ব নির্ধারিত হবে স্বতন্ত্র নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে।

৩. স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান : স্থানীয় স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের শতকরা ৬০ ভাগ এবং সংখ্যালঘিষ্ঠ সম্প্রদায়ের শতকরা ৪০ ভাগ প্রতিনিধিত্ব থাকবে।

৪. চাকরিতে সমতা : সরকরি পদসমূহের শতকরা ৫৫ ভাগ

পূরণ করবে মুসলমান সম্প্রদায় এবং যতদিন পর্যন্ত ঐ সংখ্যায় না পৌঁছাবে ততদি পর্যন্ত শতকরা ৮০ ভাগ সরকারি মুসলমানদের জন্য নির্ধারিত থাকবে।

৫. সরকার চাকরি : চাকরির ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত সমতা অর্জনের পর থেকে মুসলমান জনগণ চাকরির শতকরা ৪৫ ভাগ পাবে এবং প্রকার অ অমুসলমানগণ শতকরা ৪৫ ভাগ পাবে এবং অন্তর্বর্তীকলীন সময় করলে প্রতি হিন্দু জনগণ ২০ ভাগ চাকরি পাবেন ।

৬. ধর্মীয় অনুভূতি : ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানতে পারে, এমন কোন আইন সংসদে পাস করা যাবে না। ধর্ম | সংক্রান্ত আইন পাস করতে হলে আইনসভায় নির্বাচিত সদস্যদের সমর্থন থাকতে হবে।

৭. ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা : বলা হয় এ চুক্তিতে কোনো মসজিদ অতিক্রম করার সময় কোন শোভাযাত্রা সঙ্গীত বা বাদ্যযন্ত্র । বাজানো নিষিদ্ধ । কোন ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মুসলমানদের গো-হত্যা নিষেধ করা যাবে না। তবে উন্মুক্ত স্থানে তা না করাই ভালো । এ চুক্তির প্রায় সবগুলো শত আপাতদৃষ্টিতে মুসলমানদের অনুকূলে ছিল। চিত্তরঞ্জন দাস আইনসভায় বলেন, স্বরাজ্যের বুনিয়াদ রচনা আমাদের প্রধান লক্ষ্য। স্বরাজ লাভের পর আমাদের সরকার না মুসলমান সরকারে না হিন্দু সরকার এরূপ কোন সংশয় মতে আমাদের মনে জাগ্রত না হয় সেজন্য আমরা এ চুক্তিতে প্রত্যেক সম্প্রদায়ের ন্যায়সঙ্গতভাবে প্রাপ্য অংশ নির্ধারণ করি

→ ১৯২৩ সালের বেঙ্গল প্যাক্টের ব্যর্থতার কারণসমূহ : নিম্নে ১৯২৩ সালের বেঙ্গল প্যাক্টের ব্যর্থতার কারণ বর্ণনা করা হলো :

১. পৃথক প্রাদেশিকতা : ১৯২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর অ কোকোনাদ অধিবেশনে কংগ্রেস সম্প্রদায়িক প্রশ্নের ব্যাপারে কোন পৃথক প্রাদেশিক চুক্তি মেনে নিতে অস্বীকৃত জানায় । এতে মনে বাংলার মুসলিম নেতাদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। অন্যান্য চুক্তি দলের মুসলিম নেতৃবৃন্দ ও বেঙ্গল প্যাক্টের অসারতা প্রমাণে পা সুযোগ পেয়ে থাকে ।

2.সন্ত্রাসবাদীর বিরোধিতা : চিত্তরঞ্জন দাস নিজে সন্ত্রাসবাদীদের বিরোধী ছিলেন, কিন্তু তার সহচরদের কেউ কেউ সন্ত্রাসবাদীদের সাথে সম্পর্ক রেখে চলতেন। সন্ত্রাসবাদীদের সাথে স্বরাজ পার্টি সংশ্রব ও সহানুভূতি থাকায় মুসলিম সদস্যগণ বিপদের আশঙ্কা অনুভব করেন।

৩. স্বরাজী পরিষদ : ১৯২৩-২৯ সাল পর্যন্ত স্বরাজীরা যখন পরিষদে যোগদান করেন, তখন কোনো স্থায়ী মন্ত্রিসভা গড়ে উঠেনি এবং হস্তান্তরিত বিষয়সমূহ প্রাদেশিক গভর্নর কর্তৃক শাসিত হচ্ছিল। এ নীতির কারণে অধিকাংশ মুসলিম নেতাই রাজনৈতিক আইন থেকে দূরে সরে পড়তে বাধ্য হয়।

৪. কলকাতা কর্পোরেশন : কলকাতা কর্পোরেশন অধিক সংখ্যক মুসলমান নিয়োগের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত না কারণে মুসলমানদের মনে এ ধারণা বদ্ধমূল হয় যে, স্বরাজীরা

মুসলমানদের অধিকার বাস্তবায়িত করতে চায় না। ফলে তারা এ সম্পর্কে সন্দিহান হয়ে পড়েন।

৫. স্বরাজীদের নানা প্রকার অভিযোগ : স্বরাজীরা নানা প্রকার অভিযোগের প্রতিবাদে আইনসভা হতে ওয়াক আউট করলে প্রতিবাদের ঝড় উঠে। হিন্দুরা ভাবে মুসলমানরা তাদের স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য ব্রিটিশ সরকারের পক্ষে যোগ দেবে। এর ফলে উভয়ের মধ্যে সম্প্রদায়িক মনোভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

৬. চিত্তরঞ্জন দাসের মৃত্যু : সুযোগ্য নেতৃত্বের অভাবে বেঙ্গল প্যাক্টের কার্যধারা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। ১৯২৫ সালের ১৫ জুন চিত্তরঞ্জন দাসের মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর সাথে বেঙ্গল প্যাক্ট ও স্বরাজ পার্টির অপূরণীয় ক্ষতি হয়। চিত্তরঞ্জন দাস খুব জনপ্রিয় নেতা ছিলেন উদার নৈতিক মতবাদের জন্য তিনি হিন্দু মুসলিম সকলের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা অর্জন করেছিলেন এবং দেশবন্ধু আখ্যা লাভ করেছিলেন।

উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, বাংলার হিন্দু মুসলিম রাজনৈতিক ও সামাজিক সহযোগিতা স্থাপনের ক্ষেত্রে বেঙ্গল প্যাক্টের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। এ চুক্তিতে মুসলমানদের প্রতি সদাচরণ, ন্যায্য অধিকার, ধর্মীয়ভাবে শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা হয়। চিত্তরঞ্জন দাসের শর্ত টিকিয়ে রাখলে সৃষ্টি হতো না হিন্দু মুসলিম দু’টি সাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদের।