― Advertisement ―

spot_img

আধুনিক পশ্চিম এশিয়া (১৯৪৫ সাল পর্যন্ত)

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়(ইতিহাস বিভাগ)বিষয় : আধুনিক পশ্চিম এশিয়ার ইতিহাস (১৯৪৫ সাল পর্যন্ত)বিষয় কোড : 241507 ক-বিভাগ (ক) UAR এর পূর্ণরূপ কি?উত্তর : UAR এর পূর্ণরূপ হলো- United...
Homeআধুনিক পশ্চিম এশিয়ার ইতিহাসসাদ জগলুল পাশার নেতৃত্বে মিশরের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন আলোচনা কর।

সাদ জগলুল পাশার নেতৃত্বে মিশরের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন আলোচনা কর।

ভূমিকা : মিশর একসময় ব্রিটিশদের ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র ছিল। মিশরের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে এবং মিশরের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে যে ক’জন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নিজেদের মেধা, শ্রম ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার দ্বারা মিশরীয় জনগণের প্রতিনিধিত্ব করেছেন তাদের মধ্যে মিশরের তৃতীয় পর্যায়ের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের নেতা সা’দ জগলুল পাশা অন্যতম। তিনি তার নেতৃত্বে গড়ে উঠা একটি রাজনৈতিক দল দ্বারা মিশরের রাজনীতি, শাসননীতি, অর্থনীতি, ধর্ম ও সংস্কৃতির মাধ্যমে এ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে চাঙ্গা করেন এবং মিশরকে পূর্ণ স্বাধীনতার দিকে নিয়ে যান।

জগলুল পাশার পরিচয় : সা’দ জগলুল পাশা উত্তর মিশরের গারবিয়া প্রদেশের ইরিয়ানা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। Encyclopedia of Britinica-এর তথ্যানুযায়ী তিনি ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে জন্মগ্রহণ করেন। গ্রামের মক্তবে তিনি বাল্য শিক্ষা অর্জন করেন এবং উচ্চ শিক্ষা সমাপ্ত করেন মিশরের আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তিনি ১৮৯২ সালে আপিল বিভাগের আদালতে বিচারক নিযুক্ত হন। ১৯০৬ সালে মিশরের শিক্ষামন্ত্রী এবং ১৯১০ সালে আইনমন্ত্রী নিযুক্ত হন। পরবর্তীকে মিশরের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আসেন ।

জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে তার ভূমিকা : সাদ জগলুল পাশা মিশরের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃত। নিম্নে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা সবিস্তারে আলোকপাত করা হলো :
Ward Party : প্যারিস শান্তি সম্মেলনের পর যখন দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয় যে, সাম্রাজ্যবাদী শক্তি মিশরকে নিয়ে খেলতে চাচ্ছে তখন উইংগেট সুলতানের ষড়যন্ত্র প্রতিরোধ করে ব্যাপক গণআন্দোলন পরিচালনার জন্য সা’দ জগলুল পাশা ১৩ই নভেম্বর ‘মিশরীয় ডেলিগেশন’ বা ‘আল ওয়াফাতুল মিশরী’ নামক স্থায়ী কমিটি গঠন করেন। বস্তুত এই পরিপ্রেক্ষিতেই মিশরের ইতিহাসে জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দল ‘ওয়াকফ’ এর জন্ম হয় যা ১৯৫২ সাল পর্যন্ত মিশরের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিল ।

Ward Party ও মিশরের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে জগলুল পাশা : উরাবী পাশা, আব্দুহূ এবং মোস্তফা কামিলের | অসাধারণ নেতৃত্বে মিশরে পরিচালিত গতিশীল আন্দোলনের ফলে মিশর একদিকে যেমন ব্রিটিশ শাসনের মূলে কুঠারাঘাত করে, অন্যদিকে তুরস্কের অধীনতা থেকেও বের হতে থাকে। এর মাঝে ১ম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ব্রিটেন মিশরের ভৌগোলিক অবস্থান এবং সুয়েজ খালের গুরুত্ব অনুধাবন করে মিশরকে নিজেদের সাম্রাজ্যভুক্ত করে নেন। এমতাবস্থায় মিশরকে আশ্রিত রাজ্য বাতিল এবং পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে মিশরে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন দানা বাঁধে। ব্রিটিশরা যুদ্ধের পর মিশরকে স্বাধীনতা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিলে যুদ্ধে মিশর ব্রিটেনকে সহযোগিতা করে। কিন্তু যুদ্ধ শেষে ব্রিটিশরা প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করলে আবার আন্দোলন চাঙ্গা হয়ে উঠে। এ সময় সা’দ জগলুল পাশা, আব্দুল আজিজ ফাহমী এবং আলী শারারীর সমন্বয়ে গঠিত একটি অস্থায়ী কমিটি ১৯১৮ সালের ১৩ নভেম্বর স্যার রেজিনাল, উইংগেটের সাথে দেখা করে আশানুরূপ ফলাফল পায়নি। এরপর প্যারিস শান্তি সম্মেলনেও তাদের আশার প্রতিফলন না হলে Ward Party গঠন করেন। মিশরের পূর্ণ স্বাধীনতা আদায় এর মূল লক্ষ্য বলে ঘোষণা করা হয় এবং নিয়মতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে আন্দোলন পরিচালনার নীতি গ্রহণ করা হয় ।
ওয়াফদ পার্টি গঠনের পর মিশরের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন নতুন রূপ লাভ করে। জগলুল পাশা বিভিন্ন দাবি আদায়ে ব্রিটিশ সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করলে ব্রিটিশ সরকার তাকে শান্তি সম্মেলনে যোগ দিতে বাধা সৃষ্টি করে। এর প্রতিবাদে তিনি সম্মেলনের দিন অর্থাৎ ১৩ জানুয়ারি ১৯১৯ এক জোরালো ভাষণ দেন। এরপর ব্রিটিশ সরকার তাকে যেকোনো ধরনের সভা সম্মেলন করতে নিষেধাজ্ঞা দেয়। ৮ মার্চ জগলুল পাশাসহ আরও তিনজন নেতাকে গ্রেফতার করলে কৃষক, শ্রমিক, সরকারি কর্মচারী, আইনজীবী সবাই কাজ বন্ধ ঘোষণা করে এবং হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে। জগলুল পাশার অনুপস্থিতিতে সারাবী পাশা আন্দোলন পরিচালনা করে । এর মাঝে রুশদী পাশার নেতৃত্বে ব্রিটিশ আদলে একটি মন্ত্রিপরিষদ গঠিত হলে ব্রিটিশপন্থি হওয়ায় জনগণ তা ভেঙে দেয়। এরপর জগলুল পাশা মুক্তি পেলে তিনি আবারো আন্দোলন চালিয়ে যান। ১৯২০ সাল পর্যন্ত মিশরের সমস্যাগুলো চিহ্নিতকরণের জন্য Lord Milar এর নেতৃত্বে “মিলার কমিশন” মিশরে আসে। এ কমিশন ব্যর্থ হলে ১৯২১ সালে লর্ড এ্যালেনবি ইঙ্গ-মিশর চুক্তি সম্পাদনের জন্য সুলতানকে লন্ডনে একটি প্রতিনিধি দল প্রেরণের কথা জানায় । মিশরে জগলুল পাশার নেতৃত্বে আন্দোলন আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠলে তিনি আবার গ্রেফতার হন। কিন্তু এসময় চতুর্মুখী চাপ স ও বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হলে লর্ড এ্যালেনবি ব্রিটিশ সরকারকে ও মিশরের একক স্বাধীনতা ঘোষণার পক্ষে সুপারিশ করেন। এর প্রেক্ষিতে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ ১৯২২ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি এককভাবে মিশরের স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়। এভাবে মিশরের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের তৃতীয় স্তরের সমাপ্তি ঘটে।

উপসংহার : উপরিউক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, মিশরের স্বাধীনতার এবং জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে জগলুল পাশা এক অন্যান্য ব্যক্তি ছিলেন। মিশরের স্বাধীনতার জন্য তিনি জীবনে একাধিকবার নির্বাসিত হয়েছেন এবং অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন। তার নেতৃত্ব এবং বলিষ্ঠ পরিচালনায় ওয়াফদ পার্টি একসময় জনগণের পার্টিতে রূপ নেয়। জগলুল পাশার প্রতিষ্ঠিত ওয়াফদ পার্টি ব্রিটেনের অধীনতা থেকে মিশরের যুক্তিতে অন্যান্য সাংগঠনিক ভূমিকা পালন করে। সুতরাং বলা যায়, জগলুল পাশা ছিলেন মিশরের একজন প্রকৃত জাতীয় নেতা ।