― Advertisement ―

spot_img

রাশিয়া ও সোভিয়েত ইউনিয়নের ইতিহাস (১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত)

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়(ইতিহাস বিভাগ)বিষয় :রাশিয়াও সোভিয়েত ইউনিয়নের ইতিহাস (১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত)বিষয় কোড : 241509 ক-বিভাগ (ক) কাকে মুক্তিদাতা জার' বলা হয়?উত্তর : দ্বিতীয় আলেকজান্ডারকে । (খ) ক্রিমিয়ার যুদ্ধ...
Homeরাশিয়া ও সোভিয়েত ইউনিয়নের ইতিহাসরুশ নেতা লেনিন-এর কৃতিত্ব মূল্যায়ন কর।

রুশ নেতা লেনিন-এর কৃতিত্ব মূল্যায়ন কর।

ভূমিকা : পৃথিবীর প্রতিটি বিপ্লব ও অভ্যুত্থানের পটভূমিতে একজন মূল ব্যক্তি থাকেন। যার নেতৃত্বের কারণে বিপ্লব সফলতার আলো দেখতে পায়। তেমনিভাবে রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের পেছনে যে নামটি চিরস্মরণীয় হয়ে আছে তিনি হলেন ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভ যিনি লেনিন উপনামেই সর্বাধিক পরিচিত। তার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব, তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা এবং গভীর দেশপ্রেমের কারণে রাশিয়ার একটি সফল সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সংঘটিত হয়। ফেব্রুয়ারি ১৯১৭ সালের বুর্জোয়া বিপ্লবের পর বুর্জোয়া সরকার জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে পারেনি। কৃষক- শ্রমিকসহ সকল মেহনতি মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে লেনিন “The ..League of Struggle for the Emancipation of Working Class” প্রতিষ্ঠা করেন। তার হাত ধরে ১৯১৭ সালে রাশিয়াতে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মধ্য দিয়ে একটি শোষণহীন সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়।

নিম্নে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো :

১. জন্ম ও পারিবারিক অবস্থা : তার পুরো নাম ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভ উপনাম লেনিন। তিনি ভি আই লেনিন নামেও পরিচিত। ১৮৭০ সালের ২২ এপ্রিল রাশিয়ার কাজন প্রদেশের যিমরিক্ক শহরে তার জন্ম। বাবা ইলিচ উলিয়ানভ বিদ্যালয়ের প্রাদেশিক পরিচালক এবং মা একজন সুশিক্ষিতা ছিলেন। তিনি মা একাধারে জার্মান, ফরাসি এবং ইংরেজি ভাষায় পারদর্শী ছিলেন। মূলত লেনিনের বড় হওয়ার পিছনে তার মায়ের উৎসাহ ব্যাপকভাবে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে।

২. শিক্ষাজীবন : প্রাথমিক শিক্ষা পরিবার হতে সমাপ্ত করার পর স্থানীয় প্রতিষ্ঠান হতে লেনিন উচ্চ মাধমিক পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন। অতঃপর তিনি কাজন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। এ সময় কার্ল মার্কস-এর সমাজতান্ত্রিক আদর্শ প্রচার করা বই পুস্তক লেখনীর মাধ্যমে তিনি মার্কসবাদী আদর্শের আকৃষ্ট হন । বিশ্ববিদ্যালয়ে বরাবর তিনি ছাত্রদের পক্ষে একটি দাবি নিয়ে আন্দোলন করায় কাজান বিশ্ববিদ্যালয় হতে তাকে বহিষ্কার করা হয়। পরবর্তীতে জার সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করার অপরাধে তাকে একটি গ্রামে আটক করে রাখা হয়। এই আটক অবস্থায় লেনিন মার্কসবাদের সাহিত্যগুলো গভীরভাবে অধ্যয়ন করেন।

৩. মার্কসবাদে প্রবেশ : ছাত্রদের পক্ষ জার সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের অপরাধে লেনিনকে যখন অবরুদ্ধ করে রাখা হয় তখন এই অবসর সময়ে তিনি মার্কসের সাহিত্যগুলো গভীরভাবে অধ্যয়ন করার সুযোগ পান। দীর্ঘ অধ্যয়ন ও চিন্তার পর লেনিনের উপলব্ধি হয় যে, মার্কসবাদীদের মধ্যেই রাশিয়ার মুক্তি সম্ভব । তাই তিনি কাজানের একটি মার্কসবাদী চক্রে যোগদান করেন। এই চক্রের পরিচালনার ছিলেন এম ই ফেদেসিয়েদ। পড়াশুনার পর তিনি মার্কসবাদ প্রতিষ্ঠা করাকে জীবনের লক্ষ্যে হিসেবে গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। অপরাধ হতে মুক্তি পাওয়ার পর লেনিন সেন্স পিটার্সবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতক পাস করেন।

কর্মজীবনের লেনিন : ছাত্র জীবনের সমাপ্তি হলে লেনিন আইন পেশায় যোগদানের মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন। এর পাশাপাশি তিনি মার্কসবাদী আন্দোলনে সক্রিয় হন। নিম্নে বিস্ত ারিত আলোচনা করা হলো :

১. মার্কসবাদী চক্র গঠন : কর্মজীবনের শুরুতে লেনিন সামারায় মারকিট আদালতে আইনজীবী হিসেবে প্রাকটিস শুরু করেন। এটি ছিল ১৮৯২ সালের মার্চ মাস। যেখানেই লেনিন তার ধ্যান-জ্ঞান মার্কসবাদী চক্র গড়ে তোলেন। এখানে অবস্থানকালীন মার্কসবাদী লেখক প্লেখানড-এর “Our Difference” গ্রন্থটি অধ্যয়ন করেন ।

২. সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক গ্রুপের সদস্য : সামারায় মার্কসবাদের সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হওয়ার পর লেনিন সেন্ট পিটার্সবার্গে চলে যান। পিটার্সবার্গের গিয়ে তিনি মার্কসবাদের সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক গ্রুপের সাথে যুক্ত হন। তিনি এই গ্রুপে একজন সক্রিয় সদস্য হয়ে মার্কসবাদ অধ্যয়ন ও তত্ত্ব প্রচারে আত্মনিয়োগ করেন। লেনিন তার অধ্যয়ন ও চিন্তা-ভাবনা দ্বারা উপলব্ধি করেন যে, সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে শ্রমিক শ্রেণিকে এই আন্দোলন যুক্ত করতে হবে।

৩. ঐক্যবদ্ধ মার্কসবাদী পার্টি গঠন : ১৯৮৫ সাল সেপ্টেম্বর মাস। এ সময় লেনিন স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। দেশে ফিরে তিনি মার্কসবাদী ও সোশ্যালিস্ট পার্টিগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। এই পদক্ষেপের অংশ হিসেবে ২০টি মার্কসবাদী চক্রকে একত্রিত করে একটি লীগ গঠন করেন । যার নাম দেওয়া হয় “The leaugue of struggle for the emancipation of the working class.’ এটি ছিল রাশিয়ার মার্কসবাদী দল গঠনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রথম পদক্ষেপ।

  1. পত্রিকা ও প্রকাশনা : ১৯০০ সালটি ছিল রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক দলগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর। এ বছর ভ্লাদিমির লেনিন মার্কসবাদ প্রচারের জন্য একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। আর এক্ষেত্রে মার্কসবাদী লেখক প্লেখানড তাকে সহায়তা করেন। লেনিনের প্রকাশিত পত্রিকার নাম দেওয়া হয় ইসক্রা। ইসক্রা শব্দের অর্থ স্ফুলিঙ্গ ।

৫. লেখালেখির মাধ্যমে মার্কসবাদ প্রচার : মার্কসবাদ প্রচারের জন্য লেনিন যে পত্রিকাটি প্রকাশ করেন তা ১৯০০ সালের ১১ ডিসেম্বর প্রথম প্রকাশিত হয়। ইসক্রা নামক এই পত্রিকাটি মার্কসবাদ প্রচার ও প্রসারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই পত্রিকার মাধ্যমে লেনিনের সমাজতন্ত্রের উপর লেখা প্রবন্ধ প্রকাশিত হতে থাকে। পত্রিকা প্রকাশের মূল উদ্দেশ্য ছিল মার্কসবাদের প্রচার শ্রমিকদের সংগঠিত করা এবং বিপ্লবের বাণী প্রচার করা ।

৬. ১৯০৩-এর লন্ডন সম্মেলন : ১৯০৩ সালে লেনিন বিপ্লবী দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করার লক্ষ্যে লন্ডনে একটি ঐতিহাসিক সম্মেলন আহ্বান করেন। এ সম্মেলনে তিনি দুটি বিষয়ে আলোকপাত করে বক্তব্য প্রদান করেন। প্রথমত, এ সম্মেলনের উদ্দেশ্য নিয়ে। আর তা হলো সফল সমাজতান্ত্রিক দলগুলোকে নিয়ে একটি ঐক্যবদ্ধ দল গঠন করা, দ্বিতীয়ত এ দলের কর্মসূচি ঘোষণা। এর কর্মসূচি হলো সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব। এ সম্মেলন হতে সমাজতান্ত্রিক দলগুলো দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে ৷

৭. এপ্রিল থিসিস : ১৯১৭ সালের ৪ এপ্রিল দিনটি রাশিয়ার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। এ দিন লেনিন তার দীর্ঘদিনের চিন্তা গবেষণা হতে যে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন তা প্রকাশ করেন। এটি এপ্রিল থিসিস নামে পরিচিত। এপ্রিল থিসিসে তিনি বলেন, ১. সামরিক সরকারের সাথে সমঝোতা হবে না; ২. যুদ্ধ বন্ধের প্রচারণা চালাতে হবে; ৩. সকল ভূ-সম্পত্তি রাষ্ট্রীয়করণ করা হবে; ৪. দশের সর্বত্র সোভিয়েতগুলোতে ক্ষমতা দখল করতে হবে; ৫. বলশেভিক কম্যুনিস্ট নামে পরিচিত হবে ও ৬. উৎপাদন ও বণ্টনের উপর জাতীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

৮. জুলাই বিক্ষোভ : ১৯১৭ সালের জুলাই মাসে রাশিয়া জার্মানির বিরুদ্ধে দক্ষিণ গ্যালিসিয়া উদ্ধারের জন্য হামরা করে। এ হামলা পুরোপুরি ব্যর্থ হলে রাশিয়া ইউক্রেনের একটি অংশ জার্মানির কাছে হারায় এবং এতে প্রায় ৬০,০০০ সাধারণ সৈনিক হতাহত হয়। এ অভিধানের জনগণ বিক্ষোভ ফেটে পড়ে। প্রায় ৫ লক্ষ কৃষক-শ্রমিক ও জনতা একত্রিত হয়ে পেট্রোগ্রাদ শহরে বিক্ষোভে প্রদর্শন করে। এই বিক্ষোভে কিছু সৈনিক যোগদান করে এবং তারা একটি অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করে। লেনিন এই সিদ্ধান্তে সমর্থন দেননি।

৯. আত্মগোপন : জুলাই মাসের ঘটনার পর বলশেভিক পার্টি নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। এ পার্টির বহু নেতাকর্মী হতাহত এবং গ্রেফতার হয়। দলের সভাপতি লেনিনকে সরকার জার্মানির হিসেবে প্রচার করতে হবে এবং তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। গ্রেফতার এড়াতে তিনি ফিনল্যান্ডে আত্মগোপন করেন এবং সেখান থেকে গোপনে পার্টিকে নির্দেশনা দিতে থাকেন।

১০. সশস্ত্র অভ্যুত্থানের সিদ্ধান্ত : ১৯১৭ সালের আগস্ট মাসে লেনিনের অনুমতিক্রমে ও তার নির্দেশে দলের ৬ষ্ঠ কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। এটি দল নিষিদ্ধ হওয়ার পর প্রথম কংগ্রেস। উত্ত কংগ্রেসে দলের দু’জন সদস্য ছাড়া বাকি সবাই সশস্ত্র বিপ্লব করার পক্ষে ব্যয় দেন। লেনিনের নিজেরও এই সশস্ত্র অভ্যুত্থানের পক্ষে সিদ্ধান্ত ছিল। কিন্তু বলশেভিক দলের দু’জন সদস্য এই সিদ্ধান্তে দ্বিমত থাকায় তা ফাঁস করে দেয়। এর ফলে বুর্জোয়া সরকার ভীত হয়ে পড়ে ৷

১১. অক্টোবর বিপ্লব এবং দেশ গঠনে লেনিন : ১৯১৭ সালের ২৫ অক্টোবর সেই কাঙ্ক্ষিত দিনটি এসে যায়। ১০ অক্টোবর তারিখে পার্টির বৈঠক বসে। এ বৈঠকের উদ্দেশ্য ছিল বিপ্লবের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে গ্রহণ করা। পার্টি বৈঠকে উপস্থিত সদস্যদের সকলে ২৫ অক্টোবর তারিখে, সশস্ত্র অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পেট্রোগ্রাদ দখল করা হবে। এ সিদ্ধান্ত মোতাবেক ২৫ তারিখ বলশেভিক পার্টির নেতাকর্মীর শ্রমিক মুক্তিকামী জনগণের সাথে নিয়ে পেট্রোগ্রাদ শহরে প্রবেশ করে। এতে বুর্জোয়া সরকারের প্রধানমন্ত্রী কেরনস্কি পালিয়ে যায়। বলশেভিক পার্টি বিনা বাধা ও বিনা রক্তপাতে রাজধানী দখল করে বিপ্লবের পর লেনিন দুটি ডিক্রি জারির মাধ্যমে দেশের সকল সম্পদ রাষ্ট্রায়ত্তকরণ করেন। একটি সমাজতান্ত্রিক সংবিধান প্রণয়ন করা হয়। এভাবে মহানায়ক লেনিন একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন ।

উপসংহার : পরিশেষে বলা যায়, ১৮৭০ সালে জন্মগ্রহণ করা রাশিয়ার এই মহানায়ক লেনিন মাত্র অল্প সময় রাশিয়াকে একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রূপদান করতে সক্ষম হন। বিপ্লবের পর একটি যুদ্ধ বিধ্বস্ত ও অর্থনৈতিক মেরুদণ্ডহীন রাষ্ট্রকে অত্যন্ত সুকৌশলে তিনি তিলে তিলে গড়ে তোলেন। দেশের ধর্মীয়, সামাজিক সকল প্রকার সংস্কার করেন। ১ম বিশ্বযুদ্ধ হতে রাশিয়াকে সরিয়ে এনেও বিচক্ষণতার পরিচয় দেন। লেনিন শান্তির জন্য ডিক্রি ও ভূমির জন্য ডিক্রি জারির মাধ্যমে রাষ্ট্রকে সমাজতান্ত্রিক মতবাদে পূর্ণাঙ্গতা দান করেন ।