― Advertisement ―

spot_img

১৯৪৭ সালে ভারত কেন বিভক্ত হয়েছিল? এই বিভক্তি কি অপরিহার্য ছিল?

অথবা, ১৯৪৭ সালের ভারত বিভক্তির প্রেক্ষাপট আলোচনা কর। ভূমিকা : পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো শাসনই চিরস্থায়ী নয়। যার শুরু আছে তার শেষও আছে। তবে কারো কারো...
Homeদক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসভারত ছাড় আন্দোলনের (১৯৪২) পর্যালোচনা কর ।

ভারত ছাড় আন্দোলনের (১৯৪২) পর্যালোচনা কর ।

অথবা, ভারতছাড় আন্দোলনের বিভিন্ন দিক আলোচনা কর ।

ভূমিকা : ১৯৪২ সালের ক্রিপস মিশন ভারতীয় মানুষ তথা প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর স্বার্থরক্ষা করতে না পারায় এটি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। এর ফলে ভারতের নতুন রাজনৈতিক সমস্যার সৃষ্টি হয়। এমতাবস্থায় কংগ্রেস ভারতের স্বাধীনতা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ে। এর ফলে গান্ধীজি একটি চূড়ান্ত দাবিকে সামনে রেখে আন্দোলন গড়ে তুলে। ১৯৪২ সালে ৮ আগস্ট গান্ধীজির নেতৃত্বে কংগ্রেস ব্রিটিশ অপশক্তিকে ভারত থেকে বিতাড়িত করে পূর্ণ স্বাধীনতার অর্জনের জন্য ভারতছাড় আন্দোলন শুরু করে ।

→ ভারতছাড় আন্দোলন : ১৯৪২ সালের ২৬ এপ্রিল মহাত্মা গান্ধী ‘হরিজন’ পত্রিকায় প্রথম ভারতছাড় পরিকল্পনা ব্যক্ত করেন। মূলত ১৯৪২ সালের ক্রিপস প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানে নতুন করে ভারতে রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক জটিলতা সৃষ্টি হয় এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সংকটময় পরিস্থিতি ব্রিটিশ সরকারকে ভাবিয়ে তোলে। গান্ধীজি ব্রিটিশদেরকে ভারতের হাতে ভারতের দায়িত্বভার ছেড়ে দেয়ার জন্য ব্রিটিশ সরকারকে অনুরোধ করেন। গান্ধীজির এরকম প্রস্তাবে ভারতীয় অন্যান্য নেতৃবৃন্দ দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু মহাত্মা গান্ধী তার সিদ্ধান্তে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলেন। তিনি বলেন, ভারতের কয়েকটি বিশেষ অঞ্চলে ব্রিটিশ সেনানিবাস থাকতে পারে কিন্তু রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক ক্ষমতা থাকবে ভারতীয়দের হাতে। ব্রিটিশ সরকার এ প্রস্তাবকে প্ররোচনামূলক বলে উল্লেখ করেন। গান্ধীজি তার প্রস্তাবে সংকল্পবদ্ধ থাকার কারণে কংগ্রেস প্রস্তাবকে মেনে নিতে বাধ্য হয় এবং ১৯৪২ সালে ৮ আগস্ট মুম্বাই অধিবেশনে

কংগ্রেস ‘ভারতছাড়’ প্রস্তাব পেশ করেন। এ প্রস্তাবে বলা হয় ভারতের মঙ্গলের জন্য ব্রিটিশ শাসনের অবসান অপরিহার্য। তাছাড় ভারতকে স্বাধীন করতে হলে ভারতের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করতে এবং এ সরকার ভারতের সকল শ্রেণির গ্রহণযোগ্য একটি শাসনতন্ত্র রচনা করবে।

→ ভারতছাড় আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য : নিয়ে ভারতছাড় আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য আলোচনা করা হলো :

১. সাধারণ জনগণের অংশগ্রহণ : ভারতছাড় আন্দোলনে সাধারণ জনগণের অংশগ্রহণ ছিল চোখে দেখার মতো। স্বতঃস্ফূর্তভাবে সকলেই এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে। প্রায় অনেক অঞ্চলেই রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে নয়, বরং সাধারণ জনগণের নেতৃত্বে আন্দোলন হয় ।

২. ভয়াবহতা ও ব্যাপকতা : ভারতছাড় আন্দোলন ছিল ব্রিটিশ বিরোধী অন্য যেকোনো আন্দোলনের চেয়ে অধিক ভয়াবহ। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহ ও আইন অমান্য আন্দোলনের চেয়েও অধিকতর ব্যাপকতা ছিল। গান্ধীজির অসহযোগ আন্দোলন অনেকটাই অহিংস ছিল কিন্তু ভারতছাড় আন্দোলন অহিংস পার পরিচালিত হয়নি। এই আন্দোলনে দল, মত নির্বিশেষে সবাই অংশগ্রহণ করে ফলে এই আন্দোলন একটি ভয়ঙ্কররূপে পরিণত হয়।

৩. ছাত্রদের অংশগ্রহণ : ভারতছাড় আন্দোলনে সচেতন ছাত্র সমাজের অংশগ্রহণ আন্দোলনকে আরও গুরুত্ববহ করে তোলে। ফলে এই আন্দোলনে ছাত্র সমাজের অংশগ্রহণ একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে উঠে । ভারতের অনান্য জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মতো ভারতছাড় আন্দোলনেও ছাত্ররা অংশগ্রহণ করেছিল ।

৪. কৃষকদের অংশগ্রহণ : ব্রিটিশদের শাসনে সবচেয়ে বেশি শোষিত হতো কৃষকরা। ইংরেজদের কর্তৃক জোরপূর্বক নীল চাষ কৃষকরা ভুলতে পারেনি। ফলে কৃষক শ্রেণি স্বতঃস্ফূর্তভাবে এ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে। কৃষক শ্রেণির মধ্যে প্রান্তিক কৃষক এ আন্দোলনকে ভয়াবহ রূপদানে ভূমিকা রেখেছিল ।

৫. নারীদের অংশগ্রহণ : এ আন্দোলনের অন্যতম দিক ছিল নারীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ । বিশেষ করে স্কুল কলেজের ছাত্রীরা এ আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করে ।

৬. জাতীয় সরকার গঠন : ব্রিটিশ সরকার ভারতছাড় আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী বিদ্রোহীদের উপর দমন-পীড়ন শুরু করে। তবুও এ আন্দোলন থেমে থাকেনি। এই আন্দোলন একটি জাতীয় সরকার গঠনের চেষ্টা চালায়। এর ফলে ভারতে কিছু সময়ের জন্য হলেও ব্রিটিশ শাসন বাধাগ্রস্ত হয় । ভারতছাড় আন্দোলনের গুরুত্ব : নিম্নে ভারতছাড় আন্দোলনের গুরুত্ব আলোচনা করা হলো :

১. জাতীয়তাবাদী ভাবধারার বহিঃপ্রকাশ : ভারতছাড় আন্দোলনের ফলে ভারতবর্ষে নতুন করে জাতীয়তাবাদী ভাবধারার উন্মেষ ঘটে। এমনকি ব্রিটিশরা বুঝতে পারে এই জাতীয়তাবাদী চেতনা তাদেরকে ভারত থেকে বিতাড়িত করবে। ফলে ব্রিটিশরা এই জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে নস্যাৎ করার জন্য নিষ্ঠুর দমননীতির আশ্রয় নেয় ।৪. রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বয়হীনতা : আন্দোলনের শুরুটা করেছিল কংগ্রেস। এটি এমন একটি আন্দোলন ছিল যা ন সকল ভারতীয়দের আন্দোলনে রূপ নেয়। কিন্তু এই আন্দোলন 1 ক্রমশই স্থবির হয়ে যায়।

২. সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি : ভারতছাড় আন্দোলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ভারতের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে যে দাঙ্গা- হাঙ্গামা লেগে থাকতো তা অনেকটাই কমে যায়। ভারতছাড় আন্দোলন চলাকালীন সময়ে ভারতবর্ষে কোনো ধরনের সাম্প্রদায়িক হাঙ্গামা হয়নি ।

৩. সমগ্র ভারতে আন্দোলন : এ আন্দোলন সমগ্র ভারতে বিরাজ করে। এই আন্দোলনের ব্যাপকতা ব্রিটিশ সরকারকে স্ত ম্ভিত করে দিয়েছিল। এ আন্দোলনের সময় কংগ্রেসের নেতৃবৃন্দ কারাগার ছিল। শুধুমাত্র সাধারণ মানুষ এ আন্দোলনকে জীবিত রাখে এবং সমগ্র ভারতে বিস্তার ঘটায়। এ আন্দোলন কোনো নেতাকর্মীর নির্দেশনা ছাড়াই চলতে থাকে যা ছিল বিস্ময়ের বিষয়।

৪. স্বাধীনতা অর্জনে দৃঢ় সংকল্প : এ আন্দোলনের আন্দোলনকারীদের একটিই লক্ষ্য ছিল, ভারতের স্বাধীনতা অর্জন । তারা ভারতের স্বাধীনতার জন্য বদ্ধপরিকর ছিল। যেকোনো উপায়ে যেকোনো আন্দোলনের মাধ্যমে হলেও স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনার মানসিকতা ছিল ।

৫. ক্ষমতা হস্তান্তরে উদ্যোগী : ভারতছাড় আন্দোলনের মাধ্যমে ব্রিটিশরা বুঝতে পারে ভারতবর্ষে তাদের টিকে থাকা সম্ভব না। মূলত ভারতছাড় আন্দোলনকে ভারতবাসীর স্বাধীনতা সংগ্রামের চূড়ান্ত পর্যায় বলে অভিহিত করা হয়। এর ফলে ব্রিটিশরা বুঝতে পারে যে আলোচনার মাধ্যমে ভারতের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করাই শ্রেয় ।

ভারতছাড় আন্দোলনের ব্যর্থতার কারণ : নিম্নে ভারতছাড় আন্দোলনের ব্যর্থতার কারণগুলো তুলে ধরা হলো :

১. সুসংগঠিত নয় : ভারতছাড় আন্দোলনটি সমগ্র ভারতে ছড়িয়ে পড়েছিল। এই আন্দোলনের ব্যাপকতা দেখে ব্রিটিশরা ভয় পেয়ে যায়। কিন্তু আন্দোলনের ব্যাপকতা থাকলেও সরকারের দমননীতির কারণে আন্দোলনটি সুসংগঠিত হতে পারেনি। এই আন্দোলন অনেকটা ছিল বিক্ষিপ্ত প্রকৃতির। ভারতছাড় ব্রিটিশ বিরোধী হওয়াই এটি যেমন ভারতবর্ষের সকল অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল, ঠিক তেমনি সংঘবদ্ধতার অভাবে এই আন্দোলন ব্যর্থ হয়ে যায় ।

২. ক্ষণস্থায়ী আন্দোলন : ভারতছাড় আন্দোলন এমন একটি আন্দোলন যেখানে সকল সাধারণ মানুষ অংশগ্রহণ করেছিল । কিন্তু আন্দোলনটি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারেনি। সরকারের নিষ্ঠুর দমনের কারণে খুব কম সময়ের মধ্যেই আন্দোলনটি স্থবির হয়ে যায়। এমনকি আন্দোলনকে দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য ভারতীয়দের কাছে উপযুক্ত শক্তি ও জনবল ছিল না।

৩. সংহতি ও সমন্বয়ের অভাব : ভারতছাড় আন্দোলনে সংহতি ও সমন্বয়ের অভাব ছিল। অনেক অঞ্চলেই সাধারণ জনগণ এই আন্দোলনের সমন্বয় করে। ফলে দক্ষ সমন্বয়হীনতার অভাবে আন্দোলনগুলো মন্থর হয়ে যায়। এমনকি এ আন্দোলনের নীতি ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন রকম ছিল। এই আন্দোলনে এক এক অঞ্চল এক এক নীতি অনুসরণ করে। আন্দোলন কোথাও ছিল শান্তিপূর্ণ কোথাও ছিল ধ্বংসাত্মক।

মধ্যে সমন্বয়ের অভাব ছিল। এছাড়া দলগুলোর নানা দাবি- – দাওয়ার প্রেক্ষিতে নানা মতভেদ ছিল। রাজনৈতিক দলগুলোর এই সমন্বয়হীনতাই ভারতছাড় আন্দোলনের ব্যর্থতার অন্যতম কারণ ।

৫. কংগ্রেসের নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধ : কংগ্রেস দলটি দুটি – ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। একটি গান্ধীজির পক্ষে অন্যটি বিপক্ষে। না ফলে ভারতছাড় আন্দোলন নিয়ে তাদের মধ্যে মতবিরোধ ছিল। তাদের মধ্যে আন্দোলনের কৌশল প্রশ্নে যথেষ্ট মতপার্থক্য ছিল। –

৬. মুসলিম লীগের বিরোধিতা : মুসলিম লীগ শুরু থেকেই এ আন্দোলনে বিপক্ষে ছিল না। মুসলিম লীগ প্রধান মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ আন্দোলন থেকে মুসলমানদের সরে আসতে বলেন ।

৭. সঠিক নেতৃত্বের অভাব : বিশ্বের ইতিহাসে যেকোনো আন্দোলন তখনই সফল হয় যখন আন্দোলনটি সঠিক নেতৃত্বের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ভারতছাড় আন্দোলন দক্ষ নেতৃত্বের অভাবে ব্যর্থ হয়ে যায়। এমনকি নেতৃবৃন্দের মধ্যে মতভেদ ও অসহযোগিতা আন্দোলনকে ব্যর্থ করে তোলে ।

উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, ভারতছাড় আন্দোলন ব্রিটিশ শাসনের বিরোধিতার শেষ আক্ষেপ। ভারত স্বাধীনতা পাওয়ার জন্য অনেক আন্দোলন করেছে তারমধ্যে ভারতছাড় আন্দোলন ব্রিটিশদের শেষ পরিণতি নিয়ে আসে। যদিও ভারতছাড় 5 আন্দোলন ব্যর্থ হয় তবুও এ আন্দোলন ভারতবর্ষে ব্রিটিশ সরকারকে একটি চরম সতর্কবাণী দেয়। এ আন্দোলনের ফলে ব্রিটিশরা এটি বুঝতে পারে ভারতবর্ষের তাদের ক্ষমতার অবসান এখন সময়ের ব্যাপার ।