― Advertisement ―

spot_img

১৯৪৭ সালে ভারত কেন বিভক্ত হয়েছিল? এই বিভক্তি কি অপরিহার্য ছিল?

অথবা, ১৯৪৭ সালের ভারত বিভক্তির প্রেক্ষাপট আলোচনা কর। ভূমিকা : পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো শাসনই চিরস্থায়ী নয়। যার শুরু আছে তার শেষও আছে। তবে কারো কারো...
Homeদক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসভারতে কোম্পানি শাসনের অবসান হয়েছিল কেন? ব্যাখ্যা কর।

ভারতে কোম্পানি শাসনের অবসান হয়েছিল কেন? ব্যাখ্যা কর।

অথবা, ভারতে কোম্পানি শাসনের অবসান হয়েছিল কেন? বর্ণনা কর।

ভূমিকা : ভারতে কোম্পানি শাসন বলতে বুঝায় ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ ইস্ট- ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন । ১৭৫৭ সালে পলাশির যুদ্ধে বাংলার নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা পরাজিত হলে ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে ক্ষমতা চলে যায়। এরপর তারা ভারতবর্ষে শোষণ ও নির্যাতন আরম্ভ করেন। বাংলার জনসাধারণ দীর্ঘ ১০০ বছরের অসন্তোষের কারণে ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহে অংশগ্রহণ করেন। যার ফলে আরম্ভ হয় সিপাহি বিদ্রোহ। ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের পর ১৮৫৮ সালে ভারতে কোম্পানি শাসনের অবসান ঘটে।

→ ভারতে কোম্পানি শাসনের অবসানের কারণ : নিয়ে ভারতে কোম্পানি শাসনের অবসানের কারণ বর্ণনা করা হলো :

১. ভারতবাসীর প্রথম গৌরবময় বিদ্রোহ : ভারতবর্ষে সিপাহি বিদ্রোহ ছিল এক গৌরবময় বিদ্রোহ। ভারতীয় উপমহাদেশের জনগণ শুরু থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনকে তেমন কোন প্রতিবাদ ছাড়াই মেনে নিয়েছিল। কিন্তু কোম্পানি এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তাদের একের পর এক অন্যায় নীতির বোঝা চাপিয়ে দিয়েছিল। এ সময় কোম্পানির শাসনের প্রতি অসন্তোষ বৃদ্ধি পায় এক পর্যায়ে তা আগুনে রূপ নেয়। যার ফলে ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহের ঘটনা ঘটে। অবশ্য শেষপর্যন্ত সিপাহি বিদ্রোহ সফল হয়নি। কিন্তু এই ঘটনা ভারতে কোম্পানি শাসনের অবসান ঘটায় ।

২. কোম্পানি শাসনের অবসান : সিপাহি বিদ্রোহের পর ব্রিটিশ সরকার মনে করে ভারতে আর কোম্পানি শাসন চলতে দেওয়া উচিত না। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৮৫৮ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ইন্ডিয়া অ্যাক্ট বা ভারত শাসন আইন পাশ করা হয়। এই আইনের মাধ্যমে ভারতের শাসনভার সরাসরি রানির হাতে চলে যায়।

৩. মহারানির ঘোষণাপত্র প্রকাশ : মহারানি ভিক্টোরিয়া ১৮৫৮ সালের ১ নভেম্বর এক ঘোষণাপত্র জারি করেন। এই ঘোষণাপত্রে বলা হয় ৷

(ক) মহারানি ভিক্টোরিয়ার ঘোষণাপত্রে বলা হয় ভারতীয়দের ধর্মীয় ও সামাজিক ব্যাপারে ব্রিটিশ সরকার কোনো রকম হস্তক্ষেপ করবে না।

(খ) মহারানির রাজকীয় ঘোষণায় স্বত্ববিলোপ নীতির বাতিল করা হয়।

(গ) যোগ্যতা অনুযায়ী ভারতের সবাই সরকারি চাকরিতে নিয়োগের সুযোগ লাভ করবে।

(ঘ) ভারতীয়রা ধর্মীয় স্বাধীনতা লাভ করবে।

(ঙ) ব্রিটিশ সরকার রাজনীতির নীতি পরিত্যাগ করবে এবং অভ্যন্তরীণ রাজ্যের বিষয়ে কোনো রকম হস্তক্ষেপ করবে না ।

(চ) সিপাহি বিদ্রোহের সময় প্রত্যক্ষভাবে ব্রিটিশ নাগরিকদের হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তি ছাড়া সকলকে শাস্তির হাত থেকে রেহাই দেওয়া হবে বলে ঘোষণা করা হয় ।

৪. সামরিক নীতি পরিবর্তন : ভারতে কোম্পানি শাসনের অবসানের একটি অন্যতম কারণ হলো সামরিক নীতির পরিবর্তন। কোম্পানি ভারতের বিভিন্ন ধর্মীয় ও আঞ্চলিক জাতিগোষ্ঠী থেকে সিপাহি নিয়োগের নীতি গ্রহণ করে। এতে করে অযোধ্যায় বেঙ্গল সৈনিকরা ব্যাপক অসন্তষ্ট হন। এছাড়া সেনাবাহিনীতে ইউরোপীয় বৃদ্ধি করা হয় এবং গোলান্দাজ বাহিনীতে ভারতীয়দের নিয়োগ বন্ধ করা হয়। এসব কারণে ভারতীয় সেনাবাহিনী তাদের পতন ঘোষণা করে।৫. বোম্বাই ও মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির আইন প্রণয়ন ক্ষমতা পুনর্বহ : ১৮৩৩ সালের সনদ আইনে গভর্নর জেনারেল ও পরিষদের হাতে হি | মাদ্রাজ ও বোম্বাই প্রেসিডেন্সির আইন প্রণয়নের ক্ষমতা অর্পণ করা পর হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৮৬১ সালের সনদ আইনে মাদ্রাজ ও বোম্বাই আইন প্রণয়নের ক্ষমতা পুনবহাল করা হয়। এসব আইনের ফলে ধীরে ধীরে কোম্পানি শাসন পতনের দিকে ধাবিত হয়।

৬. মুঘল সাম্রাজ্যের পতন : ভারতে কোম্পানির শাসনের অবসানের একটি অন্যতম কারণ হলো মুঘল সাম্রাজ্যের পতন। ইংরেজরা মুঘল সুলতান দ্বিতীয় বাহাদুর শাহকে রেঙ্গনে নির্বাসন দেন। এতে করে মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের কারণে ব্রিটিশ সরকার ভারতের শাসন ক্ষমতা নিজ হাতে নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

৭. কোম্পানির ব্যর্থতা : ভারতে যখন কোম্পানি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠান করতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয় তখন ব্রিটিশ সরকার তাদের হাত থেকে ক্ষমতা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু করে। এর জন্য ১৭৭৩ সালে রেগুলেটিং অ্যাক্ট এবং ১৭৮৪ সালের উইলিয়াম পিটের ইন্ডিয়া অ্যাক্টের মাধ্যমে কোম্পানি ক্ষমতা ব্রিটিশ পার্লামেন্টে নেওয়ার পদক্ষেপ গ্রহণ করে। যার ফলশ্রুতিতে পরবর্তীতে ভারতে কোম্পানি শাসনের ঘটে।

৮. ভূমিকর বৃদ্ধি : ঊনবিংশ শতকের প্রথমদিকে ভারতের অর্থনীতি খুব নাজুক হয়ে পড়ে। কৃষির উন্নয়নের জন্য কোনো বিনিয়োগ না করে কোম্পানি ভূমিকর বাড়াতে থাকে। যার ফলে ভারতের বিভিন্ন অসন্তোষ লক্ষ করা যায়। যার ফলে জনগণ কোম্পানি শাসনের অবসান কামনা করে ।

৯. অর্থনৈতিক সংকট : ভারতে কোম্পানি শাসনের পতনের আরেকটি কারণ হলো অর্থনৈতিক সংকট। কারণ এ সময় কৃষির উৎপাদন কমে যায়। যার ফলে কোম্পানির আয়ও কমতে থাকে। কিন্তু কোম্পানি পরিচালনা করার জন্য তাদের বড় অর্থের খরচ বহন করতে হতো। যা মেটাতে গিয়ে কোম্পানির লাভের পরিমাণ একেবারেই তলানির দিকে যেতে থাকে। একারণে ভারতে কোম্পানির শাসন ধীরে ধীরে পতনের দিকে ধাবিত হয়।

১০. দুর্নীতিপরায়ণ : ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পতনের অন্যতম কারণ হলো দুর্নীতি। একদিকে কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ কমে যাওয়ার ফলে এবং অন্যদিকে কর্মচারীদের দুর্নীতির কারণে কোম্পানি তার জৌলুস হারাতে থাকে। দুর্নীতির কারণে ভারতে কোম্পানি শাসনকে পতনের দিকে ধাবিত করে।

উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহ ভারতের ইতিহাসে মহাবিদ্রোহ নামে পরিচিত। এটা ভারতের বিদেশি শক্তির বিরুদ্ধে প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ। বিদেশি শাসকদের উৎখাত করার জন্য সিপাহিদের নেতৃত্বে এ বিদ্রোহ শুরু হয়েছিল। এ বিদ্রোহে ভারতীয়রা জয়লাভ করতে না পারলেও সিপাহি বিদ্রোহের ফলে ব্রিটিশ সরকার ভারতে কোম্পানি শাসনের পতন ঘটান। এরপর ১৮৫৮ সাল থেকে ভারতে সরাসরি ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক শাসনব্যবস্থা পরিচালিত হতে থাকে ।