― Advertisement ―

spot_img

আধুনিক পশ্চিম এশিয়া (১৯৪৫ সাল পর্যন্ত)

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়(ইতিহাস বিভাগ)বিষয় : আধুনিক পশ্চিম এশিয়ার ইতিহাস (১৯৪৫ সাল পর্যন্ত)বিষয় কোড : 241507 ক-বিভাগ (ক) UAR এর পূর্ণরূপ কি?উত্তর : UAR এর পূর্ণরূপ হলো- United...
Homeআধুনিক পশ্চিম এশিয়ার ইতিহাসউনিশ শতকে আরব জাতীয়বাদ চেতনার উদ্ভব ও বিকাশ আলোচনা কর।

উনিশ শতকে আরব জাতীয়বাদ চেতনার উদ্ভব ও বিকাশ আলোচনা কর।

অথবা, উনিশ শতকে আরব জাতীয়তাবাদের
অথবা, উনিশ শতকে আরব জাতীয়তাবাদের উদ্ভব ও বিকাশ মূল্যায়ন কর।

ভূমিকা : ১২৮৮ সালে তুর্কি বীর আরতুগবল গাজীর ছেলে ওসমানের মাধ্যমে সেলজুক সালতানাতের ধ্বংসস্তূপের উপর গড়ে উঠে ওসমানীয় সালতানাত। ওসমানীয় সুলতানদের অদমক্য সাহস, মেধা ও ন্যায়বিচারের ফলে অল্প বিষয়ের মধ্যেই তারা ৩টি মহাদেশব্যাপী শাসন ক্ষমতা লাভ করে। বর্তমান পশ্চিম এশিয়ার আরব রাষ্ট্রগুলোও এসময় ওসমানীয় খিলাফতের অধীনে আসে। কিন্তু অষ্টাদশ শতকের শেষদিকে এসে উসমানীয় সুলতানগণ ভোগবিলাসে মত্ত হয়ে স্বৈরাচারী হয়ে উঠলে আরব অঞ্চলগুলো ধীরে ধীরে স্বাধীনতার চেতনা জাগ্রত হয়ে উঠে আরবরা তাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে আরব জাতীয়তাবাদ চেতনার প্রতিষ্ঠা করে। এ সময় বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনের মাধ্যমে এই অঞ্চলের জনগণের মধ্যে আরব জাতীয়তাবাদের চেতনা সম্প্রসারিত হতে থাকে। ওয়াহাবী আন্দোলন, গুপ্ত সমিতি, নেপোলিয়নের মিশর জয়, গ্রিক বিদ্রোহ এই আরব জাতীয়তাবাদী চেতনা প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নিম্নে প্রশ্নালোকে উনিশ শতকে আরব জাতীয়তাবাদের উদ্ভব ও বিকাশ আলোচনা করা হলো :

১. ওয়াহাবী আন্দোলন : আরব জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রথম ধাপই ছিল ওয়াহাবী আন্দোলন, আন্দোলনের প্রবক্তা মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহাব (১৭০৭-১৭৯২) সৌদি আরবের নজদে জন্মলাভ করেন। বয়সকালে তিনি ইসলামে ধর্মের নামে যেসকল কুসংস্কার যেমন পির ও মাজার পূজা ও অন্যান্য বিদয়াতি কার্যকলাপের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেন। তার এই আন্দোলন ইতিহাসে ওয়াহাবী আন্দোলন নামে প্রসিদ্ধ। তিনি ওসমানীয় খিলাফতে ইউরোপীয় যে সকল অনৈসলামিক কার্যকলাপের অনুপ্রবেশ ঘটেছে তার বিনাশে ব্যাপক প্রচারণা শুরু করেন। তাছাড়া তুর্কি সুলতানদের অতিরিক্ত খ্রিস্টান তোষণ নীতিরও তিনি তীব্র বিরোধিতা করেন। ১৭৪৭ সালে তিনি বিচ্ছিন্ন আরব ভূখণ্ডগুলোকে একই ছাতার তলে নিয়ে আসতে সক্ষম হন। ১৭৬৫ সালে তার মৃত্যুর পর তার পুত্র আব্দুল আজিজ সউদ ওয়াহাবীদের নেতা হয়ে তুর্কি শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে ইরাকের উপকণ্ঠ পর্যন্ত দখল করে নেন। ১৮০৩ ও ১৮০৪ সালে ওয়াহাবীরা মক্কা ও মদিনা দখল করে ইবনে সউদের নামে খুতবা পাঠ শুরু করেন। ১৮১১ সালে ওসমানীয় গভর্নর মোহাম্মদ আলী পাশা ওয়াহাবীদের দমন করে আরব ভূখণ্ডগুলো পুনরায় ওসমানীয় সালতানাতের অধীনে নিয়ে আসেন।

২. নেপোলিয়নের মিশর জয় : আরব জাতীয়তাবাদের উদ্ভব নেপোলিয়নের মিশর বিজয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের সাথে ব্রিটিশদের সরাসরি যোগযোগ ছিন্ন করার জন্য নেপোলিয়ন ১৭৯৮ সালে মিশর দখল করে নিলে উচ্চপদস্থ তুর্কি ও মামলুকরা পালিয়ে যান। উদরতা দেখিয়ে নেপোলিয়ন স্থানীয় যোগ্য মিশরীয়দের হাতে ক্ষমতা অর্পণ করেন এবং তাদের পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা দান করেন। তাছাড়া তার সাথে অজ্ঞাত কবি, সাহিত্যিক ও ঐতিহাসিকদের মাধ্যমে ফরাসি বিপ্লবের চেতনা মিশরবাসীর মধ্যে সঞ্চারিত করেন।

৩. মিশরে নিয়োগকৃত তুর্কি গভর্নরের বিরোধিতা : তুর্কি সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদ মিশর পুনরুদ্ধারের জন্য মোহাম্মদ আলী পাশাকে স্বসৈন্যে প্রেরণ করেন। তিনি ব্রিটিশদের সহায়তা ১৮০১ সালে মিশরে পুনরায় তুর্কি শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। পাশা মিশরে তার ক্ষমতা সুসংহত করে পুত্র ইব্রাহীম পাশাকে দেখে নিয়ে মক্কা ও মদিনায় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮১১ সালে তিনি সফলভাবে গ্রিসের বিদ্রোহ ও দমন করেন। পাশাপাশি সিরিয়া, ফিলিস্তিন, লেবানন ও ক্রিটে অটোমান সালতানাতের ভিত্তি মজবুত করেন। ১৮৩৩ সালে তিনি মিশরের এবং পুত্র ইব্রাহীম পাশা সিরিয়ার গভর্নর নিযুক্ত হন। এ সময় পিতা ও পুত্রের শাসনের ফলে এই অঞ্চলে ব্যাপক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জিত হয়। ইব্রাহীম পাশা আরবি ভাষা ও সংস্কৃতির বিকাশে এই অঞ্চলে মিশনারিদের সহযোগিতায় প্রচুর স্কুল কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। এই সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আরব জাতীয়তাবাদের উদ্ভব ঘটে।

৪. বলকান রাষ্ট্রসমূহের স্বাধীনতা আন্দোলন : আরব জাতীয়তাবাদের উদ্ভবে বলকান রাষ্ট্রসমূহের স্বাধীনতা আন্দোলন বিশেষ ভূমিকা পালন করে। এ সময় পূর্ব ইউরোপের বলকান রাষ্ট্রসমূহ স্বাধীনতার দাবিতে ব্যাপক আন্দোলন সংগ্রাম শুরু করেন এবং ১৮২৫ সালে গ্রিস স্বাধীনতা লাভ করে। পরে ধারাবাহিকভাবে অন্যান্য বলকান রাষ্ট্রগুলো ও স্বাধীনতা লাভ করলে পশ্চিম এশিয়া অঞ্চলের আরব ভাষাভাষী অঞ্চলে আরব জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রসার ঘটে। যা তাদেরকে পর্যায়ক্রমে স্বাধীনতা আন্দোলনের দিকে ধাবিত করে ।
আরব জাতীয়তাবাদের বিকাশ : উপরিউক্ত ঘটনাবলির প্রেক্ষিতে আরব ভূখণ্ডের জনগণের মধ্যে আরব জাতীয়তাবাদের চেতনার জন্ম হয় এবং খ্রিস্টান মিশনারি, গুপ্ত সমিতি, জামাল উদ্দিন আফগান, নাসিফ ইয়াজিজী প্রমুখের মাধ্যমে এই জাতীয়তাবাদের বিকাশ সাধিত হয় ।

১. খ্রিস্টান মিশনারীদের ভূমিকা : ইব্রাহীম পাশা ১৮৩৩ সালে সিরিয়ার গভর্নর হয়ে বন্ধ হয়ে যাওয়া খ্রিস্টান মিশনারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ পুনরায় চালু করার অনুমতি দান করেন। ফলে এ সময় মার্কিন প্রটেস্ট্যান্ট ও ফরাসি ক্যাথলিক প্রচুর স্কুল কলেজ গড়ে উঠে। ১৮৬৬ সালের মধ্যে শুধু মার্কিন প্রটেস্ট্যান্ট মিশনারিয়া সিরিয়া এরকম ৩৩টি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। বৈরতে ১টি প্রিন্টিং প্রেস প্রতিষ্ঠা করে সেখান থেকে আরবি ভাষা, শিক্ষা সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ে প্রচুর বই ও পুস্তিকা প্রবন্ধে করা হয় যা আরব জনগণের মধ্যে আরব জাতীয়তাবাদ বিকাশে ভূমিকা রাখে ।

২. খ্রিস্টান ব্যক্তিদের অবদান : এ সময় আরবজাতীয়তাবাদ বিকাশে বিভিন্ন খ্রিস্টান জ্ঞানী ব্যক্তিগণ ও অনন্য ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেন। এর মধ্যে নাসিফ ইয়াজিজী অন্যতম। তিনি তার লেখনীর মাধ্যমে আরবি ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিশাল ভাণ্ডার জনগণের সামনে নিয়ে আসেন এবং আরব জাতীয়তাবাদ বিষয়ে তাদের উদ্বুদ্ধ করেন। বুতরাস আল বুস্তানী তার প্রকাশিত Suriyya পত্রিকায় সিরিয়াকে পিতৃভূমি ঘোষণা দিয়ে সিরিয়াবাসীকে স্বাধীনতার দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। তাছাড়া তিনি আরব জনগোষ্ঠীর জন্য ১০ বছর পরিশ্রম করে মুহিত আল মুহিত নামে একটি অভিধানও রচনা করেন। ইব্রাহীম আল ইয়াজিজী তার প্রকাশিত নাগাহ, দিয়াহ তাবিবসহ বিভিন্ন পত্রিকা ও ম্যাগজিনে তারবদের ইতিহাস ঐতিহ্য ও জ্ঞানবিজ্ঞানের কথা তুলে ধরে আরববাসীকে সচেতন করে তোলেন।

৩. বিভিন্ন সংগঠনের অবদান : : এ সময় আরব জাতীয়তাবাদ বিকাশে বিভিন্ন সংগঠন ও কার্যকরী ভূমিকা পালন করেন। ১৮৪৭ সালে প্রতিষ্ঠিত Society of science and arts এরকমই একটি প্রতিষ্ঠার এরা বিভিন্ন লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আরব জাতীয়তাবাদ প্রচার করে। Oriental Society ও ১৮৭৫ সালে প্রতিষ্ঠা লাভ করা The syrian scienctific society খ্রিস্টান ও মুসলমান আরব জনগোষ্ঠীর সম্মিলনে গঠিত হয়। তবে ১৮৭৫ সালে বৈরুতে প্রতিষ্ঠিত Secret Society of Beirut আরব জাতীয়তাবাদ বিকাশে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তারা বিভিন্ন দেয়াল লিখন ও পোস্টারিং-এর মাধ্যমে আরব জনগোষ্ঠীর মধ্যে স্বাধীনতা চেতনা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন।

৪. বিভিন্ন মুসলিম ব্যক্তিদের ভূমিকা : এ সময় আরব জাতীয়তাবাদ বিকাশে বিভিন্ন মুসলিম ব্যক্তিরা ও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন। এর মধ্যে জামাল উদ্দিন আফসানীর নাম অগ্রগণ্য। তিনি ১৮৭১-১৮৭৯ পর্যন্ত মিশরে অবস্থান করে প্রচার করেন যে মিশর হবে মিশরীয়দের তিনি বিভিন্ন সভা সমাবেশ ও বিতর্ক অনুষ্ঠানে এই বিষয়ে জনমত গড়ে তুলেন। আফগানীর সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে মুহাম্মদ আব্দুহ প্যারিসে একটি গুপ্ত সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন যার মাধ্যমে আরব জাতীয়তাবাদ প্রচারে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল। আব্দুর রহমান আল কাওয়াকিবি তার Al- Muayyad পত্রিকায় তুর্কি সুলতানদের সমালোচনা করে প্রবন্ধ রচনা করেন এবং আরব বাসীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। আরব জাতীয়তাবাদ বিকাশের আরেক আলোচিত ব্যক্তিত্ব হলো নাজির আজুরি। তিনি তুর্কি স্বেচ্ছাচারী শাসনের প্রতিবাদে জেরুজালেমের সহকারী গভর্নর পদত্যাগ করে তুর্কি শাসনের সমালোচনা করে আরববাসীকে আরব জাতীয়তাবাদের চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।

উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, উনিশ শতকের মাঝামাঝি থেকে তুর্কি সুলতানদের দুর্বল ও স্বেচ্ছাচারী শাসনের হয় । আরব ফলে আরব ভূখণ্ডগুলোতে আরব জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রসার এবং তুর্কি তুর্কি শাসনের বিরুদ্ধাচারণ শুরু জাতীয়তাবাদের উদ্ভবে ভূমিকা রাখে ওয়াহাবী আন্দোলন, নেপোলিয়নের শিকার বিজয় মিশরের গভর্নর মোহাম্মদ আলী পাশা ও তার পুত্র সিরিয়ার গভর্নর ইব্রাহীম পাশার আরব বলকান রাষ্ট্রসমূহের স্বাধীনতা জাতীয়তাবাদী চেতনা ও আন্দোলন। আর আরব জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশ সাধিত হয় বিভিন্ন খ্রিস্টান মিশনারি প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তিবর্গ, গুপ্ত সমিতি এবং বিভিন্ন মুসলিম তাত্ত্বিকদের নিরবিচ্ছিন্ন প্রচেষ্টার মাধ্যমে। এ সফল মুসলিম তাত্ত্বিকদের মধ্যে জামাল উদ্দিন আফগানি, মুহাম্মদ আব্দুহ, আব্দুর রহমান আল কাওকাবি ও নাজিব আজুরি ভূমিকা বিশেষভাবে প্রসিদ্ধ।