― Advertisement ―

spot_img

আধুনিক পশ্চিম এশিয়া (১৯৪৫ সাল পর্যন্ত)

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়(ইতিহাস বিভাগ)বিষয় : আধুনিক পশ্চিম এশিয়ার ইতিহাস (১৯৪৫ সাল পর্যন্ত)বিষয় কোড : 241507 ক-বিভাগ (ক) UAR এর পূর্ণরূপ কি?উত্তর : UAR এর পূর্ণরূপ হলো- United...
Homeআধুনিক পশ্চিম এশিয়ার ইতিহাসআধুনিক সৌদি আরবের জনক হিসেবে বাদশাহ আব্দুল আজিজ ইবনে সউদের অবদান মূল্যায়ন...

আধুনিক সৌদি আরবের জনক হিসেবে বাদশাহ আব্দুল আজিজ ইবনে সউদের অবদান মূল্যায়ন কর ।

ভূমিকা : বিশ্ব ইতিহাসে যে কয়জন শাসক একটি দেশ বা জাতির স্রষ্টা হিসেবে পরিচিত হয়ে আছেন, সৌদি আরবের বাদশাহ আব্দুল আজিজ ইবনে সউদ তন্মধ্যে অন্যতম । ন তিনি শুধু একজন দক্ষ সমরকুশলী যোদ্ধাই ছিলেন না; বরং একজন দূরদর্শী রাজনীতিবিদ হিসেবেও তিনি কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন। ফলে অতি সাধারণ অবস্থা থেকে তিনি নিজ মেধা,প্রতিভা ও যোগ্যতাবলে সৌদির মতো বিক্ষিপ্ত গোত্রভিত্তিক বেদুইন অধ্যুষিত একটি অঞ্চলকে একক শাসকের অধীনে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁর দীর্ঘ ৫১ বছরের (১৯০২- ১৯৫৩) শাসনামলে পশ্চাৎপদ সৌদি আরব আধুনিকতার সোপানে উন্নীত হয়।

→ আব্দুল আজিজ ইবনে সউদের সংক্ষিপ্ত পরিচয় :
১. প্রাথমিক পরিচয় : আব্দুল আজিজ ইবনে সউদ ১৮৮০ সালে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তবে তিনি ইবনে সউদ নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন। তাঁর পিতার নাম ছিল আব্দুর রহমান। বাল্যকাল থেকেই আব্দুল আজিজ ছিলেন অতিমাত্রায় উচ্চাভিলাষী। ও পরিশ্রমী। ফলে বয়সকালে তাঁর পক্ষেই সম্ভব হয়েছিল বিক্ষিপ্ত বর্বর আরবকে এক শাসকের কর্তৃত্বাধীন নিয়ে আসা।

২. ক্ষমতার কেন্দ্রে আজিজ : শৈশবকাল থেকেই আব্দুল আজিজ যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী ছিলেন। রশিদী বংশের শাসনকর্তা মোহাম্মদ ইবনে রশিদ ১৮৯৭ সালে মৃত্যুবরণ করলে আব্দুল আজিজের সামনে সৌদিতে পুনরায় সউদ বংশের শাসন প্রতিষ্ঠার সুযোগ আসে। ফলে আজিজ ১৮৯৭ সালে একবার রিয়াদ দখলের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছিলেন। কিন্তু তিনি হতাশ হননি। ১৯০২ সালে পুনরায় রাতের অন্ধকারে কিছু দুর্ধর্ষ বেদুইন নিয়ে রিয়াদ আক্রমণ করে তা দখল করে নেন ।

৩. শাসক মনোনীত : আব্দুল আজিজের এই চরম সাহসিকতাপূর্ণ কাজের জন্য ১৯০২ সালে তাঁর পিতা আব্দুর রহমান তাঁকে নজদের আমির এবং ওহাবীদের নেতা হিসেবেও স্বীকৃতি দান করেছিলেন। তিনি রশিদী পরিবারের শেষ শাসক আব্দুল্লাহ আল আজিজ ইবনে মিতাবকে পরাজিত করে রিয়া দখল করে সৌদি বংশ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন ।

৪. রাজ্য বিস্তার : আব্দুল আজিজ ইবনে সউদ ১৯০২- ১৯০৭ সাল পর্যন্ত সৌদি রাজবংশের মর্যাদা ও হৃতগৌরব পুনঃ উদ্ধারের চেষ্টা করেন। এরপর ১৯০৮ থেকে ১৯১৩ সাল পর্যন্ত সৌদি আরবের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও শৃঙ্খলা বিধানে আত্মনিবেশ করেন। এরপর আজিজ তাঁর স্থল ও সমুদ্র বাণিজ্য সহজ করার জন্য পারস্য উপসাগরের তুর্কি অধিকৃত অঞ্চল আল হাসা আক্রমণ করে তা দখল করে নেন ।

৫. বিচক্ষণ শাসক : আব্দুল আজিজ ছিলেন একজন যুগশ্রেষ্ঠ সমাজ সংস্কারক ও বিচক্ষণ শাসক। তিনি সাফল্যের সাথে মধ্যযুগীয় আরবের গোত্রতান্ত্রিকতার অবসান ঘটান। আরবের মতো বেদুইন অধ্যুষিত গোত্রতান্ত্রিক বিক্ষিপ্ত আরবকে শতধাবিভক্তি থেকে মুক্ত করে তিনি একই শাসকের ছায়াতলে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিলেন।

→ সৌদির আধুনিকায়নে আজিজ : আব্দুল আজিজ ১৯০২ সালে রিয়াদ দখলের পর পর্যায়ক্রমে মক্কা, মদিনা, হেজাজ, জেদ্দাসহ অন্যান্য আরব ভূখণ্ড দখল করে ১৯২৩ সালে স্বাধীন- সার্বভৌম সৌদি আরব রাজ্য গঠন করেন। এরপর তিনি সৌদি ম আরবের আধুনিকায়নে নানমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। নিম্নে তা আলোচনা করা হল :

১. প্রশাসনিক সংস্কার : আব্দুল আজিজ ১৯২৩ সালে পায়ে | স্বাধীন-সার্বভৌম সৌদি আরব রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর এর প্রশাসনিক সংস্কারে মনোনিবেশ করেন। তিনি সৌদিতে ‘গোত্রীয় শাসনের চার পরিবর্তে কেন্দ্রীয় শাসন কায়েম করেন। মক্কায় ৬ জন, মদিনার ২ জন, জেদ্দায় ১ জন এবং ইয়াবুতে একজন সদস্য নিয়ে তিনি একটি জাতীয় পরিষদ গঠন করেন। তিনি প্রদেশে ওয়ালী এবং জেলায় আমির নিযুক্ত করেছিলেন।

২. বিচার বিভাগের সংস্কার : আব্দুল আজিজ হেজাজের বাদশাহ হওয়ার পূর্বে এর শাসনব্যবস্থা ছিল শেখকেন্দ্রিক। আস্তিত ক্ষমতায় এসে তাঁর পরিবর্তন করে রাজ্যে শরিয়া আইন প্রবর্তন করেন । তবে যে ক্ষেত্রে শরিয়া আইনে সমস্যার সমাধান করা যেত না, সেক্ষেত্রে বাদশাহর অধ্যাদেশই চূড়ান্ত আইন বলে গণ্য হতো। ফলে বাদশাহ ছিলেন বিচার বিভাগের শেষ আশ্রয়স্থল ।

৩. যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন : বাদশাহ আজিজ তাঁর উন্নয়ন প্রকল্পসমূহ বাস্তবায়ন করার জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের প্রতি আত্মনিবেশ করেন। তাই রাজ্যের সর্বত্র তিনি ফাঁকা সড়ক নির্মাণের ব্যবস্থা করেন। তাছাড়া ১৯৫১ সালে দাম্মাম থেকে রিয়াদ পর্যন্ত রেললাইন স্থাপন এবং বিমান যোগাযোগের ব্যবস্থা কেেরন।

৪. শিক্ষা সংস্কার : আব্দুল আজিজের পূর্বে আরবে কেবল ধর্মীয় শিক্ষা প্রচলিত ছিল। তিনি ক্ষমতায় এসে দেশের সর্বত্র ইংরেজি মাধ্যমে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। তাছাড়া এ সময় উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য তিনি বহু ছাত্রকে বিদেশেও প্রেরণ করেন।

৫. বিদ্যুৎ ও সেচ প্রকল্প : বাদশাহ আজিজ তাঁর উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য দেশের সর্বত্র বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের ব্যবস্থা করেন। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কারণে দেশে কলকারখানার উৎপাদনও বৃদ্ধি পায়। তাছাড়া এ সময় তিনি কৃষির উন্নয়নের জন্য সেচ ব্যবস্থারও প্রবর্তন করেছিলেন ।

৬. সৈন্যবাহিনীর আধুনিকায়ন : বাদশাহ আব্দুল আজিজ দেশের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বিধান ও বহিঃশত্রুর হামলা মোকাবেলা করার জন্য দেশের সৈন্যবাহিনীকে আধুনিকায়নের জন্য বিদেশ থেকে সামরিক সরঞ্জাম ও সামরিক বিশেষজ্ঞ এনে সৈন্যবাহিনীর আধুনিকায়ন করেন ৷

৭. প্রকাশনা ও শ্রম আইন চালু : বাদশাহ আব্দুল আজিজ বারিদ আল হেজাজ ছাড়াও কয়েকটি সাপ্তাহিক পত্রিকা চালু করেন। ফলে দেশ-বিদেশের খবরাখবর জানা জনগণের পক্ষে সুবিধা হয়। তাছাড়া এসময় বাদশাহ শ্রমিকদের কল্যাণ শ্রম আইন চালুর করেন।

৮. মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা : বাদশাহ আব্দুল আজিজ এ সময় সৌদি আরবের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ১৯৩০ সালে পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় এবং ১৯৩২ সালে অর্থ মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করেন। তাছাড়া ১৯৪৪ সালে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং ১৯৫১ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্থাপন করেন। ফলে এ সময় সৌদি আরবের প্রশাসন ব্যবস্থায় ব্যাপক গতিশীলতা আসে ।

উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, বাদশাহ আব্দুল আজিজ বিশ্বের সেই বিরল প্রতিভাধর শাসকদেরই একজন, যারা অতি সামান্য অবস্থা থেকে নিজ মেধা, প্রতিভা ও যোগ্যতাবলে সৌদির মতো একটি বেদুইন অধ্যুষিত গোত্রভিত্তিক আরব ভূখণ্ডকে একই শাসকের অধীনে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিলেন। ১৯২৩ সালে তিনি স্বাধীন-সার্বভৌম সৌদি আরব রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার পর এর আধুনিকায়নে ব্যাপক ও বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। ফলে তাঁর (১৯০২-১৯৫৩) এই দীর্ঘ ৫১ বছরের শাসনামলে সৌদি আরব উন্নতির সোপানে উন্নীত হয়েছিল।