― Advertisement ―

spot_img

রাশিয়া ও সোভিয়েত ইউনিয়নের ইতিহাস (১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত)

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়(ইতিহাস বিভাগ)বিষয় :রাশিয়াও সোভিয়েত ইউনিয়নের ইতিহাস (১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত)বিষয় কোড : 241509 ক-বিভাগ (ক) কাকে মুক্তিদাতা জার' বলা হয়?উত্তর : দ্বিতীয় আলেকজান্ডারকে । (খ) ক্রিমিয়ার যুদ্ধ...
Homeরাশিয়া ও সোভিয়েত ইউনিয়নের ইতিহাসঅপারেশন বাররারোসা কি? হিটলারের সোভিয়েত ইউনিয়ান আক্রমণের বর্ণনা দাও।

অপারেশন বাররারোসা কি? হিটলারের সোভিয়েত ইউনিয়ান আক্রমণের বর্ণনা দাও।

ভূমিকা : হিটলার সোভিয়েত ইউনিয়নকে আক্রমণ করে তার যুদ্ধ কৌশলের ক্ষেত্র হিসেবে। যে অভিযান সোভিয়েত ইউনিয়নকে পরাজিত ও দখল করার জন্য প্রেরণ করা হয় ইতিহাসে তা অপারেশন বারবারোসা হিসেবে পরিচিত। হিটলার সোভিয়েত ইউনিয়নের পুরোটা তার বাসনা অনুযায়ী দখল করতে না পারলেও সোভিয়েতসহ ইউরোপের অনেকাঞ্চল যুদ্ধের প্রথম দিকে হিটলার দখল করতে সফল হয়।

অপারেশন বারবারোসা : দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা হয় ১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর হিটলারের পোল্যান্ড আক্রমণের মধ্য দিয়ে। পরবর্তীতে বিদ্যুৎগতিতে ফ্রান্সসহ অনেক অঞ্চল দখল করে নেয় হিটলার। পূর্ব ইউরোপের বলকান অঞ্চলের রাজ্যসমূহ যখন জার্মানি দখল করে নেয় তখনই বুঝা যায় সোভিয়েত ইউনিয়নের দিকে জার্মান বাহিনী অগ্রসর হচ্ছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের খসড়া হিটলার ব্রিটেনের সাথে যুদ্ধ করার সময়ই প্রণয়ন করে এবং সে অনুযায়ী পরিকল্পনা তৈরি করে। সর্বাধিক কম সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটানোই ছিল হিটলারের এ পরিকল্পনার মূলকথা। কেননা নেপোলিয়নের কাছ থেকে শিক্ষাগ্রহণ করেছিল হিটলার। রাশিয়ার সাথে যুদ্ধকে নেপোলিয়ান বোনাপোর্ট দীর্ঘায়িত করে যে মারাত্মক ভুল করেছিল সে পথে হাঁটতে চাননি হিটলার। রুশ প্রতিরোধ শীত শুরু হওয়ার পূর্বে তিন মাসের মধ্যে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে বলে হিটলারের সুদৃঢ় বিশ্বাস ছিল।

হিটলার ১৯৪০ সালের ১৮ ডিসেম্বর বলকান অঞ্চলে আক্রমণের সময়েই স্বাক্ষর করেন অপারেশন বারবারোসা (Operation barbarossa) কোড নামে সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণের সিদ্ধান্তে। সিদ্ধান্তের সাথে সাথে সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ না করে সিদ্ধান্তের ৬ মাস পড়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করা হিটলারের জন্য চরম পর্যায়ের ভুল ছিল। হিটলার রুশ জার্মান অনাক্রমণ চুক্তির ২১ মাস পর এ চুক্তি ভঙ্গ করে সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করে ১৯৪১ সালের ২২ জুন। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে হিটলার এ অপারেশন বারবারোসা পরিচালনা করে ৪০,০০,০০০ সৈন্য, ৩,৩০০ ট্যাংক ৫,০০০ বোমারু বিমানসহ। বিশ্ব ইতিহাসের সর্ববৃহৎ স্থলযুদ্ধ ছিল এই অপারেশন। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে হিটলার সর্বাত্মক যুদ্ধ পরিচালনা করে তার এ বাহিনী নিয়ে ।

সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে রিসক্রিজের বা বিদ্যুতের গতিতে অপারেশন পরিচালনা করবে বলে হিটলার এবং তার জেনারেলদের পরিকল্পনা ছিল। মাত্র তিন মাসের মধ্যেই সোভিয়েতের লাল ফৌজ বা Red Army-কে সম্পূর্ণরূপে পরাজিত করা যাবে তাদের এ বিশাল বাহিনীর মাধ্যমে এবং গুড়িয়ে দেয়া যাবে সোভিয়েত ইউনিয়নের জনগণের প্রতিরোধ ব্যবস্থা এটা তাদের ধারণা ছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের জাতিগুলো জার্মানির গোলামে পরিণত হবে এবং সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা খতম হবে।
ফ্যাসিস্ট ইতালি, রুমানিয়া, হাঙ্গেরি, ফিনল্যান্ড, নাৎসিপন্থী, শ্লোভাকিয়া ও ক্রোয়েশিয়া সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে জার্মানি কর্তৃক পরিচালিত এ অপারেশন বারবারোসাতে জার্মানির পাশাপাশি যোগ দেয়। হিটলারের অপারেশন বারবারোসা এভাবেই চলে ।
সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণের কারণসমূহ : সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে হিটলার তার কৌশলগত কারণে রুশ-জার্মান অনাক্রমণ চুক্তি সম্পাদন করলেও ১৯৪১ সালে হিটলার রুশ- জার্মান অনাক্রমণ চুক্তি লঙ্ঘন করে ১৯৪১ সালের ২২ জুন সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করে।

নিচে হিটলার কর্তৃক এই অনাক্রমণ চুক্তি লঙ্ঘন করে সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণের কারণসমূহ তুলে ধরা হলো :
১. একটি কৌশলগত বিষয়মাত্র ছিল হিটলারের নিকট রুশ- জার্মান অনাক্রমণ চুক্তিটি। তাই এর প্রতি একনিষ্ঠ ছিলেন না তিনি। ঐতিহাসিক বুলকের মতামত এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। তাঁর মতে, একের পর এক নীতির দ্বারা পরিচালিত হিটলার পাশ্চাত্য শক্তির পরাজয়ের পর পূর্বের দিকে ঝাঁপ দেয় অর্থাৎ তিনি রাশিয়া,আক্রমণ করেন ।
২. রুশ-জার্মানি অনাক্রমণ চুক্তি সামঞ্জস্যহীন ছিল হিটলারের ইহুদি, শ্লাভ ও কমিউনিজম বিরোধী রাজনীতির এবং পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে। ফলে হিটলারের পূর্ব ইউরোপে সম্প্রসারণ নীতির মূল লক্ষ্যে ফিরে আসা ছিল তার সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ। হিটলার কৌশলগতভাবে অনাক্রমণ চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল যেন সামরিকভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নকে নিরপেক্ষ রাখা যায়। হিটলারের রণনীতির সঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ অনেক বেশি সঙ্গতপূর্ণ ছিল এসব দিক পর্যালোচনা করলে জানা যায় ।
৩. সোভিয়েত ইউনিয়ন জার্মানিকে প্রভূত খাদ্য ও রসদ সরবরাহ করতো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুর দিকে। জার্মানিকে রাশিয়া দূরপ্রাচ্য থেকে রাবার, টিন, নিকেল প্রভৃতি সাইবেরিয়ার পথে এনে সরবরাহ করতো। জার্মানির সামাজিক শক্তিতে রাশিয়া ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে যখন জার্মানির হাতে পশ্চিম ইউরোপে ফ্রান্সের পতন হয়। এছাড়া বন্ধ করে দেওয়া হয় সকল সরবরাহ। এজন্য রাশিয়ার উপর চরম আকারে ক্ষুব্ধ হয় জার্মানি 1.
৪. সোভিয়েত ইউনিয়ন দার্দানোলিস প্রণালির উপর তাদের নৌ-আধিপত্য দাবি করলে এতে আপত্তি জানায় জার্মানি। যার কারণে মুখোমুখি অবস্থানে চলে আসে দু’দেশ।
৫. হিটলারের সোভিয়েত ইউনিয়নে আক্রমণের পেছনে জড়িত ছিল অর্থনৈতিক কারণও। অনাক্রমণ চুক্তির ব্যর্থতায় প্রধান কারণ বা ব্যর্থতার জন্য দায়ী ছিল অর্থনৈতিক কারণই যা অধ্যাপক রাইডার মত প্রদান করেন। অর্থনৈতিক দিক থেকে হিটলারের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায় রাশিয়ার সাথে হিটলারের অনাক্রমণ চুক্তি। এ অনাক্রমণ চুক্তির সুযোগ নিয়ে বাল্টিক অঞ্চলের তিনটি রাষ্ট্র এবং বেসারাবিয়া হতে সুযোগ গ্রহণ করতে থাকে স্ট্যালিন। রাশিয়ার বলকান অঞ্চলে ও তীক্ষ্ম দৃষ্টি ছিল যা হিটলারের জন্য যথেষ্ট অস্থির। সোভিয়েত ইউনিয়নের উপর এজন্য হিটলার চড়াও হয়। হিটলারের যুদ্ধের জন্য জরুরি বিবেচিত হয় রুমানিয়ার খনিজ তেল।
এছাড়া ইউরোপ অবরুদ্ধ জার্মানির জীবন রক্ত অনেকাংশ নির্ভরশীল ছিল। রাশিয়ার বিভিন্ন কাঁচামাল; যেমন-
১. ককেশাসের তেল ক্ষেত্র এবং
২. ইউক্রেনের খাদ্যশস্য, কয়লা ও লোহার উপর হিটলার সন্তুষ্ট হতে পারেনি যখন ১৯৪৯ সালের জানুয়ারিতে একটি নতুন রুশ-জার্মান অর্থনৈতিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তাই এসব কাঁচামালের অধিকার অর্জনের জন্য হিটলার সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেয় অনাক্রমণ চুক্তি লঙ্ঘন করে।
৬. ব্রিটেনের সাথে যুদ্ধে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় জার্মানির বিরাট বিমান বহর। জার্মানিকে এই সুযোগে সোভিয়েত ইউনিয়ন তার বিরাট লোকবল নিয়ে পূর্ব দিক থেকে আক্রমণ করবে বলে হিটলার ভেবেছিল। ফলে হিটলার অগ্রগামী হয়ে নিজে থেকেই সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করেন এ সম্ভাবনাকে রোধ করার জন্য।
৭. হিটলারকে রাশিয়া আক্রমণে উদ্বুদ্ধ করে পশ্চিম ও পূর্ব, ইউরোপের রণাঙ্গনে ইতোমধ্যে জার্মানি সেনাবাহিনীর অভাবনীয় সাফল্য। তাছাড়া জার্মানির আশঙ্কা বাড়ে রাশিয়ার উত্তরোত্তর শক্তি ও ক্ষমতা বৃদ্ধিতে। হঠাৎই জার্মানি আক্রমণ করতে পারে এটা হিলার আশঙ্কা করেন। তাই আক্রান্ত হওয়া থেকে আক্রমণ করাই শ্রেয় বলে হিটলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন ।
৮. আর শেষত হিটলারের আশঙ্কা আরো বেড়ে যায় যখন ১৯৪০ সালের শেষের দিকে ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ স্যার স্ট্যাফোর্ড ক্রিপসের মস্কো সফল করে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ব্রিটেন-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মৈত্রী জোট গঠনের পূর্বেই হিটলার সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করতে চেয়েছিল।

ফলাফল : জার্মান দ্বারা অবর্ণনীয় নারকীয় তান্ডব চালানো হয় সোভিয়ে দেশগুলোর সাধারণ নাগরিকের উপর। হাজারে হাজারে ‘বন্দি শিবিরে আটক করে নির্যাতন ও হত্যা করা হয় তাদেরকে। গণহত্যা চালানো হয় গ্রামের পর গ্রামে। সাধারণ জনগণের যানমালের প্রচুর ক্ষতি হয় উভয়পক্ষের পোড়ামাটি নীতির ফলে। প্রায় ২০ মিলিয়ন সাধারণ মানুষকে এভাবে হত্যা করা হয়।
যে ব্যাপকহারে সোভিয়েত জনগোষ্ঠী নিহত হয় তার এক বিরাট অংশ ছিল সন্তান জন্মদানে সক্ষম যুবক নাগরিক গবেষক জিওফ্রে এ হাস্কিং এর মতে ।
সোভিয়েত লোকসংখ্যা ৪৫ থেকে ৫০ মিলিয়ন কমে যায় ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দের তুলনায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে। আবার জার্মানিদের অনেকে নিহত ও বাস্তুচ্যুত হয় রেড আর্মি কর্তৃক জার্মান দখল হলে ।
পূর্ব এশিয়া ও সাইলেজি রবে জার্মান জনগোষ্ঠী ওভার নাম রেকার পশ্চিম অংশে বিতাড়িত হয় ইয়াল্টা সম্মেলনের চুক্তি মোতাবেক। সোভিয়েত রাশিয়ার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ যা উপস্থাপিত হয় সোভিয়েত লেফটেন্যান্ট জেনারেল রোমান রুভেনকো কর্তৃক তা হলো :

১. এ যুদ্ধে নাৎসি আক্রমণে সম্পূর্ণভাবে বা আংশিকভাবে ১৭১০টি নগর ও শহর ১,০০,০০০টি যৌথ এবং রাষ্ট্রীয় খামার, ৭০,০০০ এর বেশি গ্রাম বা হ্যামলেট, ২৫০৮টি শিল্প স্থাপনা, ৪০,০০০ মাইলের বেশি রেলপথ, ৪১,০০০টি রেলস্টেশন, ৪০,০০০টি হাসপাতাল, ৮৪,০০০টি স্কুল এবং ৪৩,০০০টি পাবলিক লাইব্রেরি ধ্বংস হয়
২. রাশিয়ার গৃহপালিত পশু ও অনেক নিহত হয়। ৭ মিলিয়ন ঘোড়া এবং ১৭ মিলিয়ন ভেজা ও ছাগল হত্যা করা হয়।
৩. অক্ষশক্তির আক্রমণে সোভিয়েত ইউনিয়নের যে সম্পত্তি ধ্বংস হয় তার মূল্য ধরা হয় ৬৭৯ মিলিয়ন বিলিয়ন রুবলস।

উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, হিটলার মূলত সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করে উপরের উল্লিখিত কারণগুলোর জন্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মোর এ আক্রমণের মধ্য দিয়েই ঘুরে যায়। জার্মান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশগ্রহণের পূর্ব পর্যন্ত মোটামুটিভাবে সফল ছিল কিন্তু হিটলারের জন্য সোভিয়েত আক্রমণ মোটে ও সুখকর ছিল না কারণ হিটলারের, খারাপ সময়ের সূচনা হয় এরপর থেকেই ।